5 March 2018

শেষ সম্বল

পোড়ো স্কুলবাড়ির গা দিয়ে যে রাস্তাটা নতুন কলেজ বাড়ির দিকে চলে গেছে, সেখানে সন্ধ্যার পর কেউ পারতপক্ষে পা রাখে না। কেমন একটা গা ছমছমে ব্যাপার। দিনের বেলা গেলে দেখা যায়, স্কুলবাড়িটা ভেঙেচুরে একদিকে ধ্বসে গেছে, পাঁচিল বলেও কিছু আর অবশিষ্ট নেই। বড় বড় গাছের শেকড় আর ডালপালা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েছে বাড়িটাকে। রাস্তাটাও নির্জন, দু'পাশে রাজ্যের আগাছা। বড় বড় গাছপালা দিয়ে ঘেরা বলে জায়গাটা একটু ঠান্ডা, শিরশিরে। তার সঙ্গে অজানা একটা ভয়ের অনুভূতি। একা বেশীক্ষণ থাকা যায় না এদিকটায়। সেদিন দুপুরে, ওপাশের লাহাবাড়ির সবচেয়ে ডানপিটে দুই ছেলে বুবু আর তুতু এই পোড়োবাড়িতেই ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছিল। ওদের কোন ভয়ডর নেই, দুরন্ত দুপুরে খালি অ্যাডভেঞ্চারের নেশা। বাড়িতে মা ঘুমোলেই, কোন ফাঁকে ওরা দু'জনে পালিয়ে চলে আসে এখানে। স্কুলবাড়ির কোনে কোনে দামাল পায়ে ছুটে বেড়াতে লাগল ওরা। হঠাৎ ভাঙা ঘরগুলো পেরিয়ে, খোলা উঠোনটায় পড়তেই দুজনে চমকে উঠল। বুবু বলল ‘দেখ তুতু, কুয়োধারে কার যেন কাপড় শুকোতে দেওয়া আছে না?’ তুতু বলল, ‘চল তো গিয়ে দেখি। এখানে তো কখনও কেউ আসে না।' কাছে যেতেই একটা লাঠির একটু অংশ দেখা যেতে লাগল।বুবু তুতু খুব সাবধানে পা টিপে টিপে, একটু ঘুরে কুয়োতলার দিকে এগিয়ে যেতেই ওদে বুকদুটো হঠাৎ ধক্ করে উঠল।কার যেন পা দেখা যাচ্ছে কুয়োর আড়ালে। কোন সাড়াশব্দ নেই। 'এটা কে-কে শুয়ে আছে রে, তুতু?', ভয়ে বলে উঠল বুবু। 'আমি জানি না, চল পালাই', বলেই দৌড় দিল তুতু। পিছনে বুবুও। দৌড় দৌড়। পোড়ো বাড়িটার গেটের ভাঙ্গা থামদুটো পেরিয়ে, ডানদিকে বেশ কিছুটা প্রাণপনে ছোটার পরে শিমুলতলায় হারুর সাইকেল সারাইয়ের দোকান। বুকটা তখনও ওদের হাপরের মত উঠছিল নামছিল। বিকেলে সবেমাত্র হারু খুলেছে দোকানটা, খদ্দের আসাও শুরু হয়েছে। হারু ওদের মুখে সব শুনে, চোখ কপালে তুলে বলল, ‘করেছ কি তোমরা? ওই ভূতের বাড়িতে ঢুকেছ এই অবেলায়! সর্বনাশ! বাড়ি যাও এখুনি, নাহলে কিন্তু সব বলে দেব রমেনদাকে। ‘রমেনদা' তুতুর বাবা, বুবুর জ্যাঠা। দুজনেই যমের মত ভয় করে এই রাশভারী ভদ্রলোকটিকে। বেগতিক দেখে, দুজনেই গুটিগুটি রওনা দেয় বাড়ির দিকে। হারুর কোন ভয়ডর নেই, পেটানো চেহারা। সবাই বলে, ওর মত বেপরোয়া সাহসী অথচ পরোপকারী ছেলে আর দুটি হয় না। পড়াশোনাও ঠিকঠাকই করত। কিন্তু বাবা হুট করে মরে যেতে, সেসব ছেড়ে দিয়ে বাধ্য হয়েই এখন ওকে পেটের দায়ে দোকানটা চালাতে হয়। হঠাৎ একটা ব্যাপারে হারুর কেমন যেন খটকা লাগল। কে যেন শুয়ে আছে পোড়ো বাড়িটায়, বলছিল না ছেলেদুটো! ফালতু কল্পনা নয়তো? দোকানের ব্যস্ততার মধ্যেও কথাগুলো কিন্তু ও ভুলে উড়িয়ে দিতে পারল না। অ্যাডভেঞ্চারের নেশা ওরও কম নেই। ব্যাপারটা কি একটু খতিয়ে দেখা দরকার। কেউ ঘাঁটি গাড়েনি তো ওখানে চুপিসাড়ে? বা কোনও অঘটন! একটা পাংচার আর দুটো চাকা হাওয়া দেওয়া সারা হলে, ফুটবল পাম্প দিতে কলোনির ছেলেগুলো এল। রাস্তার ওপাশে পুকুরধারে বিশাল খেলার মাঠ। হারুও সময় পেলেই ওদের সঙ্গে একটু আধটু ফুটবল খেলে। হারু ঠিক করল এদের দলেই ব্যাপারটা বলে দেখা যাক। 'শোন, পুরোনো স্কুল বাড়িটাতে কে যেন লুকিয়ে আছে শুনলাম, যাবি না কি দেখতে?', হারু ওদের বলল। হারু ওদের মধ্যে খুব পপুলার, সবাই হারুদা বলতে অজ্ঞান। বয়সে বড় বলে, ওরা খুব মানেও ওকে। সেই হারুদা যখন বলছে, নিশ্চয়ই কিছু একটা ব্যাপার আছে। সুতরাং, যা শোনা তাই কাজ। দু'একজন যদিও বা একটু গাঁইগুঁই করছিল, 'কি হবে বাবা ওখানে গিয়ে, ভূতের বাড়ি' বা 'না বাবা, ওখানে সাপখোপের আড্ডা, এখন যাব না', এসব বলে, কিন্তু সমর,পলাশ,কাত্তিক সব মাথাগুলো এক পায়ে খাড়া। সুতরাং ভিতুদের প্রতিরোধ ধোপে টিঁকল না। প্রবল অত্যুৎসাহী ছেলেদের দল হৈ হৈ করে এগিয়ে চলল পোড়োবাড়িটার দিকে। সামনে অসীম সাহসী হারু, পিছনে দল বেঁধে চলল ছেলে ছোকরার দল। যদিও বোঝাই যাচ্ছে তারা একটু ভয় পেয়েছে, বিশেষত নির্জন নিস্তব্ধ স্কুল বাড়িটাতে ঢোকার পর হঠাৎ যখন একটা অজানা পাখি টিঁ টিঁ করে ডেকে উঠল কোথা থেকে। বুকটা একটু ছমছম করছে হারুরও। হারুর এই সাইকেল সারাইয়ের দোকানটা অনেক পুরোনো, বাবার আমলের। কিন্তু সব কাজকর্ম সামলাতেই রোজ সন্ধ্যে হয়ে যায়। তাই আগে কখনও ও এমন অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় ঢোকেনি এই পোড়োবাড়িটাতে। আর ঢুকেই বা কি করবে? আগাছার জঙ্গলে প্রায় সবটাই ঢাকা পড়ে গেছে যে। তবো ওর মনে হচ্ছিল, কাজটা কি ঠিক হচ্ছে? বাবার মুখে শুনেছে, এককালে বেশ নামকরা স্কুল ছিল এটা। ও কিন্তু ছোটবেলা থেকেই এরকম ভগ্ন দশাতেই দেখেছে স্কুল বাড়িটাকে। কেউ কেউ বলে, অনেকদিন আগে নাকি এটা আসলে সাহেবদের বাগানবাড়ি ছিল। তখন নাকি বিশাল রমরমা ছিল এখানে। দলে দলে সাহেব মেম জুড়িগাড়ি চেপে, মাঝে মাঝেই আসত ফুর্তি করতে। সে সব পাট চুকে যাবার পর, বিধান রায়ের আমলে এখানেই চালু হয়েছিল সরকারি স্কুলটা, 'বল্লভপুর প্রাইমারি স্কুল'। তারপরে চলেছিলও সেটা অনেকদিন। কিন্তু ঐ যা হয়। সাহেবী আমলের বাড়ি, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আগে থাকতেই ধুঁকছিল। তারপর একদিন ঝড়বৃষ্টিতে হুড়মুড় করে ধসে গেল একটা দিক। তারপর থেকে শুধু বাড়িটাতে বট-অশ্বত্থের শেকড় আর ডালপালাই গজিয়েছে, স্কুলবাড়ি হয়ে গেছে পোড়োবাড়ি। তবু আজও খেয়াল করলে খিলানের আদল, কড়ি বরগা, দেওয়ালের নকশা করা থাম আর ছাদের কিছু ভগ্নপ্রায় পঙ্খের কাজ চোখে পড়ে। যা হোক, উঠোনটা সাবধানে পেরিয়ে, আগাছা সরিয়ে, কুয়োর দিকে গামছা শুকোতে দেওয়া আছে দেখে, সেদিকেই হেঁটে চলছিল সবাই। একটু এগোতেই দেখা গেল, একটু জায়গা পরিস্কার মত করা হয়েছে আর সেখানে সত্যিই তো, একটা লাল কাপড়ের পুঁটলি আর লাঠি পড়ে রয়েছে। আরও একটু এগোতেই সবাই থমকে দাঁড়াল। দেখা গেল, ময়লা শতচ্ছিন্ন কাপড় পরে একটা বুড়ি শুয়ে আছে আকাশের দিকে তাকিয়ে, চেহারাটা শুকিয়ে কাঠ, পাকা চুলগুলো অবিন্যস্ত। চোখের দৃষ্টিটা স্থির, বড় ভয়ঙ্কর। দাঁতগুলো বিশ্রীভাবে বেরিয়ে আছে, তাকালেই বুকটা হিম হয়ে যায়। এবারে দল বড় হওয়ায় কেউ আর পালাল না ঠিক, তবে সকলেরই মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেছে, চাপা স্বরে নানা প্রশ্ন, ফিসফাস চলতে লাগল। কে এই বুড়িটা? মরলই বা কি করে? পোড়ো বাড়ি বলে তো ঢুকতেই সবাই ভয় পায়, তবুও এল কি করে বুড়িটা! কেনই বা এল! কিই বা আছে পুঁটলিতে? খবরটা চাউর হতে সময় লাগল না। তার পরেই থানা,পুলিশ,লোকজন,ভীড়ভাট্টা। সন্ধ্যে হবার আগেই পুলিশ উঠিয়ে নিয়ে গেল বডি। সঙ্গে লাঠি,গামছা,পুঁটলি। বুড়িটা নাকি মরেছে বেশ ক'দিন আগে। এমনই চামড়াসর্বস্ব হাড় জিরজিরে শরীর, যে মরে তেমন গন্ধটুকুও বেরোয়নি। আহারে, কতদিন বুঝি খেতে পায়নি বেচারা। কিন্তু বুড়িটা কে? কোনদিন তো আগে কেউ দেখেনি এ তল্লাটে! দোকানটা আর খুলল না হারু। তারও মনটা কেমন যেন ছমছম করছে। সন্ধ্যে হয়ে এল, আলো পড়ে এসেছে বেশ। বাড়ি ফিরে মাকে বলতে হবে ঘটনাটা। নিজের সাইকেলটার হ্যান্ডেলে হাত রাখতেই হারুর শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে গেল একটা ঠান্ডা স্রোত। সাইকেলের কেরিয়ারে একটা লাল পুঁটলি বাঁধা, ঠিক ওই রকমই।

No comments:

Post a Comment