25 March 2018

এক অন্ধকার ও আমি

ভোট করতে গিয়েছিলুম উড়িষ্যার বনাই এর এক প্রত্যন্ত গ্রামে,সেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছয়নি ।সন্ধ্যার অন্ধকারে যখন লঝঝড়ে ট্রাকটা আমাদের কোমর ব্যথা সমেত উগরে দিয়ে চলে গেল, মনটা আমার একেবারে হু হু করে উঠল ।এ কোথায় এলাম ?চতুর্দিকে ঘিরে ধরেছে ঘুটঘুটে অন্ধকার ।কোথাও কোথাও চিলতে লণ্ঠনের আলো বেরিয়ে এসেছে ।তার মধ্যে আবছা  স্কুলবাড়িটার অস্তিত্ত্ব। দূরে, আরো দূরে কোথাও কোথাও হালকা আলোর ইশারা বুঝে নিতে হয়। বাকি সবই মিশমিশে কালো অন্ধকার। গাঢ় অন্ধকারে কে যেন চলে গেল মানুষের অবয়ব। এখানেই এই অসহ্য অন্ধকারে থাকতে হবে এই কোলকাতার শহুরে ছেলেকে?যে আলো ছাড়া থাকেনি কখনো, এমনকি শহরের লোডশেডিংয়েও যার রয়েছে এমারজেন্সি, ইনভার্টার,ব্যাটারি?
বাক্স-পেঁটরা নামাতে হয় ওই লণ্ঠনের আলোতেই। কোনক্রমে ভাঙা অযত্নের চৌকিতে বসি। স্কুলের দারোয়ান চুলা জ্বালাতে ব্যস্ত। পাশে ব্রাম্ভণী নদীর থেকে বয়ে আসছে শিরশিরে হাওয়া।আমার সহকর্মীরা হয়ত এই অন্ধকারে অত অনভ্যস্ত নয় ,তারা খোশগল্পে মত্ত। আর আমি চারপাশে ঘিরে ধরা কালোর ভয়ে সিঁটিয়ে যেতে চলেছি।মেনে নিতে পারছিনা এই সম্পূর্ণ একক অন্ধকারকে। এই পরিবেশকে সঙ্গী করে কি করে কাটাবো এতটা সময় ?একটু আলো চাই।মন চলে যাচ্ছে বাড়ির আলোকিত ঘরটায়,যেখানে হয়ত এখন টিভি দেখছে গিন্নি,বই পড়ছে বাবা আর কম্পিউটারে গেম খেলছে ছেলে ,যাবতীয় আনন্দ উপকরণ মজুত। মোবাইলের স্ক্রিনে সভ্যতার ছোঁয়া, কিন্তু ব্যাটারি ফুরোলেই? কান্না পেতে লাগল ।
হঠাৎই উপরে মাথা তুলে চমকে উঠলাম। নিকষ কালো অন্ধকার আকাশে সমগ্র নক্ষত্রমন্ডল ফুটে উঠেছে। এত স্পষ্ট ,এত সুন্দর এই অন্ধকার আকাশে তারাদের আলো, আগে দেখিনি কখনো। কলকাতার কংক্রিটের জঙ্গলে আকাশ দেখার ফাঁক নেই ।একসঙ্গে এতটা আকাশ আর আমি- মাঝে কেউ নেই ।একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল। পৃথিবী আর সমগ্র সৌরজগতই আমাকে দেখছে যেন ।এ যেন নিজেকে এই বিশাল জগতের মাঝে নতুন করে আবিষ্কার করা। কি নিদারুন তুচ্ছ আমি। বিশাল অন্ধকার আকাশে তারাদের ঝিকিমিকি দেখতে দেখতে মনে হল আমি কি, কেন, কোথায় ?ডুবে যেতে থাকলাম সেই অদ্ভুত মহানুভবে।শহরের সব ইনভার্টার , সব ব্যাটারি যেদিন শেষ হয়ে যাবে, আমাদের ফিরতেই হবে এই আদিম অন্ধকার আকাশের নীচে ।এ এক নির্মম বাস্তব।
সেই প্রথমবার সেই প্রত্যন্ত গ্রাম্য সন্ধ্যাকে, একসঙ্গে অনেকটা ভাল লেগে গেল।

No comments:

Post a Comment