আমি আবেগ ও অনুভূতিপ্রবণ,ভাবুক আর সৃষ্টিশীল।জীবনের চলা,ওঠাপড়া আর অভিজ্ঞতা নিংড়োনো এই সব লেখা ।এ আমার পাগল মনের নিঃশেষিত প্রকাশ।
18 March 2026
তন্দ্রা এসেছিল
পড়ার টেবিলের ওপর লাফিং বুদ্ধ পেপারওয়েট চাপা দেওয়া ছোট্ট একটা চিরকুট। তাতে লেখা, 'আমার মৃত্যুর জন্য আমি ছাড়া আর কেউ দায়ী নয়। তন্দ্রা।' এই ক'টা লাইনই সেবার বাঁচিয়ে দিয়েছিল সৌগতকে। নইলে ওদের দুজনের অন্তরঙ্গ প্রেম, ঘোরাঘুরি, গোপনে ডায়মন্ড হারবার বা দীঘার ট্রিপ, এসব জানতে কারো বাকি ছিল না। সবাই মৃদু ফিসফাস করছিল, মেয়েটা নাকি সৌগতর জন্যই আত্মহত্যা করতে বাধ্য হল। পুলিশ এসে অবশ্য সৌগতকে রুটিন মাফিক কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করলেও, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ছেড়ে দিয়েছিল। আসলে সেভাবে কোন অভিযোগও জমা পড়েনি। তন্দ্রার বাবা অনেকদিন হল গত হয়েছেন। মাও ক্যান্সারে শয্যাশায়ী। সরল সাদাসিধা তন্দ্রার সঙ্গে প্রেমের খেলা খেলতে দু'বার ভাবেনি সৌগত। ওরকম সুন্দর লক্ষ্মীশ্রী, ওরকম ভরাট চেহারা। কার না নজরে লাগবে? সৌগতর পাঁচ নম্বর শিকার।
দুজনের প্রেম টিঁকে ছিল ঠিক একটা বছর। আসলে বছর বছর প্রেমিকা না বদলালে সৌগতর নিজেকে পাগল পাগল লাগত। বড় চা কোম্পানির সেলস ম্যানেজার হিসেবে তখন ওকে দেশের পূর্ব দিকটা পুরো ঢুঁড়ে ফেলতে হয়। বিশাল মাইনে, নিউটাউনে বড় ফ্ল্যাট। সৌগতর শুধু একটা জিনিসের ভীষণ চাহিদা ছিল, নিত্যনতুন প্রেমিকা। আর সেই প্রেমিকা পুরোনো হয়ে যেত মাত্র ক'দিনের মধ্যেই।
সেই সন্দেহ থেকেই ওদের সম্পর্কের শুরুর দিকে একদিন তন্দ্রা কাতরভাবে বলেছিল, 'তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না তো?'
'না গো। তাই আবার হয় নাকি?', সহজভাবে বলল সৌগত।
'তাহলে আগে যে তোমার অন্য অনেক প্রেমিকা ছিল শুনলাম, তাদেরকে ছেড়ে দিলে কেন?'
'আরে না না। তারা ঠিক প্রেমিকা ছিল না। জাস্ট একটা ক্রাশ আর কি। তাছাড়া আমার সঙ্গে ঠিক মনেরও মিল হচ্ছিল না, বুঝলে?'
'তাই নাকি?আর আমার সঙ্গে মনের মিল হয়েছে তো?না আমাকেও সময় হলে ওদেরই মতো ছুঁড়ে ফেলে দেবে?'
'ওঃ, তুমি থামবে?এরকম কথা আর কখনো বলবে না, বুঝেছ? তুমি জানো না, তোমাকে আমি কতটা ভালবাসি। নিজের থেকেও বেশি।', বাঁধা বুলি আউড়ে গিয়েছিল সৌগত। এসব অভিনয় ও ভালই পারে। তবে ওর আসল উদ্দেশ্য হল টাইমপাস। সেটা তন্দ্রা আর কী করে জানবে? বোকা মেয়ে।
সুতরাং যা হবার তাই হল। তন্দ্রাও সৌগতর নোংরা খেলায় কোন ব্যতিক্রম হতে পারেনি। এক বছরের মাথাতেই তন্দ্রাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল সৌগত। নাম্বার ব্লক করে দিল, ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপেও ব্লক। সব জেনে বুঝে, কিছুদিন তন্দ্রা খুব কান্নাকাটি করেছিল। কিন্তু হাজার হলেও মেয়ে তো, কোথায় যেন ওর বাধছিল। কীভাবে ফেরাবে সৌগতকে, তা ওর জানা ছিল না। শুধু অসহ্য যন্ত্রণা ওকে দিনরাত কুরে কুরে খেত। অস্তিত্বের সংকট নিয়ে আর কতদিন বেঁচে থাকা যায়? জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে উঠল তন্দ্রার। তারপর যখন ওর বান্ধবী স্বরলিপি একদিন ওকে জানাল সৌগতর নতুন গার্লফ্রেন্ডের কথা, তখন নিমেষের মধ্যে পৃথিবীটা ওর সামনে দুলে উঠেছিল। হঠাৎ করে সুইসাইডের সিদ্ধান্তটা তখনই নিয়ে নিয়েছিল তন্দ্রা। সিলিং ফ্যানের থেকে ওর শরীরটা যখন গলার ওড়নার ফাঁসে দুলছিল, তখন নাকি ওকে বীভৎস দেখাচ্ছিল।
সৌগত তারপর থেকে বহুদিন আর ঐ তল্লাট মাড়ায়নি। তবে শুনেছিল তন্দ্রার মার আছারি পিছারি খাওয়া কান্না আর বারবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ওর তখন অতশত ভাববার সময় ছিল না। সিক্তার প্রেমে তখন ও হাবুডুবু খাচ্ছে। দু'তিনবার ডেটিংও হয়ে গিয়েছে। সিক্তার চেহারাটা ঠিক চাবুক, তন্দ্রার মত ম্যাদামারা নয়। ক'মাস পরে সৌগতর কানে এসেছিল, তন্দ্রার মাও নাকি মারা গেছেন। ক্যান্সারের লাস্ট স্টেজ না মেয়ের মৃত্যুশোক, সে সব জানার প্রয়োজন বা ইচ্ছে কোনটাই ছিল না সৌগতর। তন্দ্রার কথা ও যথারীতি ভুলে গিয়েছিল আর মেতে উঠেছিল সিক্তার সঙ্গে 'গভীর' প্রেমে।
এই ভাবেই কেটে গিয়েছিল কয়েকটা মাস। হঠাৎ একদিন সৌগতর সামনে একটা সুযোগ এসে গেল। শিলিগুড়িতে ওর উত্তরবঙ্গের সব ক্লায়েন্টদের নিয়ে বেশ ক'টা মিটিং ছিল। সেই সুযোগটা ও কাজে লাগাতে চাইল সিক্তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ ডেটে। ওদিকে সৌগতর কলিগ তথা বন্ধু আকাশের মাত্র মাসখানেক আগে বিয়ে হয়েছে। তাই প্রস্তাবটা সৌগতই দিয়েছিল আকাশকে, 'কী রে, সামনের সপ্তাহে সেলস ট্যুরে শিলিগুড়ি যাবি নাকি আমার সঙ্গে?'
'না রে। তুই একাই যা। বড়সড় ব্যাপার।'
'ধুর, এবারে আলাদা। অ্যাকাউন্টসেরও একজন যাবে। আমি বললেই বস তোকে আমার সঙ্গে যেতে বলবে। তোর তো হানিমুনটারও ঠিকমতো সুযোগ হয়নি। এই সুযোগে স্বর্ণালীকে নিয়ে চল না। আমিও সিক্তাকে নিয়ে যাব।'
'সেটা অবশ্য ভালই বলেছিস। কিন্তু যাবি কোথায়?সেই দার্জিলিং?ও তো একঘেয়ে হয়ে গেছে। ঠান্ডা কই?'
'না রে। এবারে একটা অন্য জায়গায় যাবার প্ল্যান করেছি, লেপচাজগৎ। শিলিগুড়ি থেকে মাত্র দেড় ঘন্টার রাস্তা। পাহাড়ের উপর একটা অখ্যাত গ্রাম। ইদানিং ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে অবশ্য বেশ নাম করেছে, তবে এখনও সেরকম ভিড়ভাট্টা নেই।'
'তাই নাকি?'
'হুঁ, এরকম পাহাড়ের মেঘ রোদের মধ্যে রোমান্টিক ক'টা দিন কাটানোর সুযোগ কি আর ছাড়তে ইচ্ছে হয়? হাজার হলেও প্রেমিকমন তো! '
'সে তো বটেই। তা কি আর জানি না?', চোখ টিপল আকাশ, 'তা থাকবি কোথায়?'
'থাকার জায়গা বলতে মাত্র কয়েকটা হোমস্টে। তবে শিলিগুড়িতে ধীরেন বলে আমার একজন চেনাজানা আছে। ওর সঙ্গে আমার সব কথাবার্তা হয়ে গেছে, ওই সব বুকিং করে দেবে। তুই শুধু 'হ্যাঁ' বললেই হল।'
'নতুন জায়গা। কেমন হবে কে জানে?'
'নতুন জায়গা মানে? অসাধারণ জায়গা। চারপাশে ঘন জঙ্গল,ঝরনা, নদী, চা বাগান। পাশেই অসাধারণ ভিউ পয়েন্ট থেকে সানরাইজ দেখার সুযোগ আর তার সঙ্গে কপাল ভাল হলে ঘরের জানলা দিয়েই কাঞ্চনজঙ্ঘার দুর্দান্ত ভিউও পাবি।'
'ওঃ, তাহলে তো দারুণ হবে। চল তাহলে, ঘুরেই আসি।চারজনে মিলে বেশ জমে যাবে পুরো ট্যুরটা।', আকাশ রাজি হয়ে গেল।
দিন দুয়েকের সেলস মিটিং, ক্লায়েন্ট মিটিং, রিপোর্টিং সব সেরে, লেপচাজগৎ পৌঁছে তো ওরা দারুন খুশি। চারজনে একেবারে তুরীয় আনন্দে মেতে উঠল। আকাশ শিলিগুড়ি থেকে কিনে এনেছিল বেশ কটা হুইস্কির বোতল। ওরা মস্তির শেষ কণাটুকু শুষে নিতে চাইল দুটো দিন।
সেদিন দুপুরে জানলা দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার স্লিপিং বুদ্ধও দেখা যাচ্ছিল পরিস্কার। যাকে বলে একেবারে সোনায় সোহাগা। খেয়েদেয়ে সৌগত বলল, 'এখানে একজন লোকাল গাইড আছে, 'ডিকি'। যাবি নাকি ওর সঙ্গে পাইন বনের মধ্যে ট্রেকিং করতে?'
আকাশ তো এক কথায় রাজি, 'হ্যাঁ নিশ্চয়ই যাব। ঘরে বসে বসে কি আর প্রকৃতিকে উপভোগ করা যায়?'
সিক্তা আর স্বর্ণালীও সেই সুরে সুর মিলিয়ে বলে উঠল, 'আমরাও যাব।' ওরা দুজনেও এই ক'দিনে বেশ ভাল বন্ধু হয়ে গেছে। গল্প যেন শেষই হতে চাইছে না। চারজনই গাইড ডিকিকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
একটু রাস্তা যেতেই, হঠাৎ স্বর্ণালী সবাইকে ছাড়িয়ে আগে আগে চলতে শুরু করল। আকাশ চেঁচিয়ে বলে উঠল,' আরে একটু আস্তে চল না। ডিকিকে আগে যেতে দাও।'
'না, এখানে আমি আগে এসেছি, সব চিনি। কোন অসুবিধা হবে না।', স্বর্ণালী জোর দিয়ে বলে এগিয়ে গেল। আকাশ আর কিছু বলতে পারল না। কিন্তু ও মনে মনে একটু অবাক হল, স্বর্ণালী তোকখনো বলেনি যে ও লেপচাজগতে আগে এসেছিল, আশ্চর্য! যাই হোক, জঙ্গলের ভেতরে বড় বড় পাইন গাছের মধ্যে দিয়ে নরম পাতা বিছানো পায়ে চলা সরু একটা পথ ধরে ওরা চলতে লাগল। সেটা এঁকেবেঁকে চলে গেছে একটা পাহাড়ী ঝরনার দিকে। ওর জল নাকি ভীষণ উপকারী। ওষুধের মতো কাজ করে বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। তারা ঐ ঝরনাকে দেবতার মত পুজোও করে। ঝরনা দেখে ওখান থেকেই একটা পায়ে চলা পাহাড়ি রাস্তা ধরে ওরা ট্রেক করে ফিরে আসবে সোজা হোমস্টেতে, এরকমই প্ল্যান।
কিন্তু স্বর্ণালী ওরকম হন্তদন্ত হয়ে চলেছে কেন? সৌগত আর আকাশ বেশ অবাক হচ্ছিল। ওরা একটু পিছিয়ে পড়েছিল, কারণ মাঝে মাঝেই সিক্তা ছবি তোলার জন্য দাঁড়াতে, ওদেরও দাঁড়াতে হচ্ছিল। লোকাল গাইড ডিকি গোর্খা ছেলে, সে এই জঙ্গলটা হাতের তালুর মতো চেনে। সে পর্যন্ত স্বর্ণালীর সঙ্গে হাঁটায় পেরে উঠছিল না, বাকিদের পথ দেখাতে গিয়ে। হঠাৎ একটা জঙ্গলের বাঁকে কতগুলো গাছের আড়ালে স্বর্ণালী হারিয়ে গেল। ডিকি আর তার ঠিক পেছনে থাকা সৌগত তড়িঘড়ি এগিয়ে গিয়ে দেখল, একটু দূরে স্বর্ণালী সাদাকালো সোয়েটার পরা আর একটা মেয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা খুব যে ভালমতো ঠাহর করে দেখেছিল তা নয়, কিন্তু স্বর্ণালীর সঙ্গে কেউ একটা যে ছিল, সেটা নিশ্চিত। এই জঙ্গলে আবার কোন মেয়ে এসে উদয় হল! কোত্থেকেই বা এল! ওরা তো অবাক। ওদিকে স্বর্ণালী হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল ওদের অপেক্ষায়। ওর কাছে পৌঁছে, ডিকি আর সৌগত অবাক হয়ে দেখল স্বর্ণালী একাই দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর কেউ আশেপাশে কোথাও নেই। আরে সেই মেয়েটা কোথায় গেল? 'এখানে কে ছিল তোমার সঙ্গে?', সৌগত জিজ্ঞেস করল।
'কে আবার থাকবে? কেউ না তো?', সটান বলে দিল স্বর্ণালী।
'তার মানে? আমরা যে দূর থেকে আরও একটা মেয়েকে তোমার সঙ্গে দেখলাম বলে মনে হল।' , সৌগত অবাক হয়ে বলল।
'ভুল দেখেছ।', স্বর্ণালী রেগে বলল। কিন্তু ওর চোখ দুটো তখন বেশ অন্যরকম লাগছিল। কীরকম যেন একটা নেশার ঘোরের মতো ঘোলাটে অথচ ভাঁটার মতো জ্বলছিল। সঙ্গে একটা রাগ রাগ ভাব, যেন ভস্ম করে দেবে ওদের সকলকে। সৌগত আর বেশি কথা বাড়াল না। অন্যরাও কেউ কিছু বুঝতে পারল না। সৌগত বাধ্য হয়ে পুরো ব্যাপারটা চেপে গেল। কিন্তু ডিকি অন্যদের আড়ালে ওকে ডেকে, চাপা স্বরে বলল, 'আপনি আর আমিই তো সবার আগে ছিলাম, বলুন। আমিও কিন্তু স্পষ্ট দেখেছি আর একটা মেয়ে ছিল ম্যাডামের সঙ্গে, তাই না?'
'হ্যাঁ, তাই তো মনে হল। কিন্তু...'
'এই জঙ্গলে মেয়েটা কোথায় হারিয়ে গেল, বলুন?আশেপাশেও কোথাও দেখলাম না। কোথাও তো লুকোবার জায়গাও ছিল না, তবে?'
'সত্যিই তো!মেয়েটা একেবারে গায়েব হয়ে গেল!'
'ম্যাডামও মিথ্যে বলল, যে কেউ ছিল না। আমার কিন্তু একটু অন্যরকম লাগছে পুরো ব্যাপারটা। চলুন জলদি ফিরে যাই।', ডিকি একটা কিছু আঁচ করে ভয়ে ভয়ে বলল। সৌগতও সায় দিল। ঝরনাটা দেখেই সেদিন ওরা তাড়াতাড়ি ফিরে এল নিজেদের হোমস্টেতে।
ফেরার পথে সৌগত আর আকাশ মিলে ঠিক করল পরের দিন ভোর পাঁচটাতেই ওরাঘুম থেকে উঠে পড়বে। তারপর ভিউপয়েন্ট থেকে সানরাইজ দেখবে। ওই সময়টা কাঞ্চনজঙ্ঘাও খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। আজই শেষ দিন, সুতরাং এই সুযোগটা কিছুতেই ছাড়া যাবে না।
সন্ধ্যেবেলায় হোমস্টেতে বনফায়ারের ব্যবস্থা হল। কাঠের ধিকিধিকি আগুনে মুরগির রোস্ট আর দার্জিলিং চা। সবাই নাচে, গানে, হুল্লোড়ে মেতে উঠল। এরই মধ্যে মোবাইলটা চার্জ দিতে সৌগতকে একবার ঘরে যেতে হল। ঘরে ঢুকতেই হঠাৎ চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। এখানে এরকম ঘনঘন পাওয়ার কাট খুব স্বাভাবিক ঘটনা। যাই হোক, সৌগত ঘর থেকে বেরোতে যাবে, হঠাৎ বনফায়ারের মৃদু আলোয় ওর যেন মনে হল, সিক্তা চুপি চুপি এসে ওকে পেরিয়ে ছায়ার মতো ঘরে ঢুকে গেল, কোন কথা না বলেই। সিক্তা আবার কী করতে ঘরে ঢুকল, ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সামনে তাকাতেই সৌগত চমকে উঠল। দেখে সামনেই একটু দূরে সিক্তা, স্বর্ণালী আর আকাশ আগুনের পাশে বসে হৈ-হুল্লোড়ে ব্যস্ত। ঠিকই, ঐ তো গোলাপি জ্যাকেট পরে সিক্তা। তবে ওর পাশ দিয়ে ঘরে কে ঢুকল? সৌগতর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আর ঠিক তখনই আবার কারেন্ট চলে এল। সৌগত ঘরের মধ্যে তাকিয়ে দেখল ঘরে কেউ নেই, এমনকি বাথরুমেও কেউ নেই। তাহলে ও কাকে দেখেছিল? সিক্তার মতনই চেহারা, অথচ সিক্তা নয়। আতঙ্কে ওর গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। কোনরকমে ঘর বন্ধ করে বাইরে গিয়ে ও বাকিদের পুরো ব্যাপারটা বলল।
'তুই ভুল দেখেছিস, এ হতেই পারে না।', আকাশ জোর দিয়ে বলল।
'আলবাৎ দেখেছি।', সৌগতও জেদ ধরল।
'ওঃ, তুইও না! ওসব পুরো মনের ভুল।', আকাশ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল ব্যাপারটা।
'না রে, আমি স্পষ্ট দেখেছি। কেমন যেন ছায়া-ছায়া একটা মেয়ের অবয়ব। আমার পাশ দিয়ে চলে গেল।', সৌগত ঘোর লাগা গলায় বলল।
'আরে ছাড়ো তো! অন্ধকারে ওরকম কত কী মনে হয়।', সিক্তা বলল।
'আরে চিল করো চিল। নেশার ঘোরে কী না কী দেখেছ, ঐ নিয়ে এখন মুড অফ কোরো না প্লিজ।', স্বর্ণালীও বলল। সবাই মিলে সৌগতকে একটা চেয়ারে বসিয়ে ধাতস্থ করল। কিন্তু সেই সন্ধ্যায় সৌগতর খটকাটা আর কিছুতেই যাচ্ছিল না।
যাই হোক, রাতে খাওয়া দাওয়ার পর ওরা যে যার ঘরে ঢুকে গেল। সৌগতদের ঘরের ডানপাশেই আকাশদের ঘর, কমন কাঠের পার্টিশন।। যথারীতি উদ্দাম রাতের পর সবাই শুয়ে পড়ল। আর শুতেই সৌগত গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। ও আগেই আকাশকে বলে রেখেছিল, যে ভোরে আগে উঠবে, সে যেন ওদের কমন পার্টিশনে তিনবার নক করে। কারণ সানরাইজ দেখতেই হবে। এখানে মোবাইল টাওয়ারের কোন ঠিক ঠিকানা নেই, যে মোবাইলে মিস কল দেবে। আর চার্জ দেওয়ার অসুবিধা বলে, ওরা মোবাইল রাতে অফ করেই রাখছিল।
হঠাৎ গভীর রাতে ঘুমের মধ্যেই সৌগতর মনে হল, ওদের ঘরের দরজায় কে যেন নক করল, পরপর তিনবার। টক্ টক্ টক্। নিশ্চয়ই আকাশ, নেশার ঘোরে ব্যাটার আর কোন সময়জ্ঞান নেই। ওর তো ভোর পাঁচটায় নক করার কথা। ভাবতে ভাবতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সৌগত। ওর তখন আর ওঠার ক্ষমতা ছিল না, এমনই ঘোর। তবু বুঝেছিল, তখন প্রায় মাঝরাত। আকাশের নক করার কথাই নয়।
পরেরদিন ভোরে ওরা চারজন সূর্যোদয় দেখতে উঠে, সৌগত আকাশকে মজা করে বলল, 'কী রে, কাল মাঝরাতে আমাদের দেওয়ালে নক করছিলি কেন? তোকে তো ভোর পাঁচটায় বলেছিলাম।'
'আমি? আমি আবার কখন তোদের ঘরে নক করতে গেলাম। কী সব ভুলভাল বলছিস?', আকাশ অবাক হয়ে বলল। শুনে সৌগত বেশ দমে গেল। তবে কি ঘুম আর নেশার ঘোরে ও ভুল শুনেছে? কিন্ত ওকে অবাক করে দিয়ে সিক্তাও বলে উঠল, 'না না, আমিও শুনেছি। তবে দেওয়াল নয়, খাদের দিকের জানলার কাঁচে নক করার শব্দ। তখন অনেক রাত। তিনবার নক করেছিল, টক্ টক্ টক্।'
'বল কী? মাঝের পার্টিশানের দিক থেকে নয়?' সৌগত আরো অবাক।
'না, খাদ আর জঙ্গলের দিকে যে জানলাটা ছিল সেইটায় করেছিল। কিন্তু তখন এত গভীর ঘুম, যে আমার আর ওঠার সাধ্য ছিল না।', সিক্তা মনে করে বলল।
'ভাল করেছিস তোরা উঠিসনি। তোদের কপাল ভাল, যে তোরা উঠতে পারিসনি। ওটা নিশ্চয়ই নিশির ডাক ছিল।', স্বর্ণালী বলল।
'ধুর, কী যে বলো!', সৌগত হেসে বলল।
'না গো, পাহাড়ে এরকম হয়। নিশি এসে ডেকে নিয়ে যায় জঙ্গলে, খাদের গভীরে। যে যায়, সে আর কোনদিন ফিরে আসে না। আমি জানি।', স্বর্ণালী অদ্ভুত গলায় বলল।
'তোদের কারোর নেশা কাটেনি মনে হচ্ছে, এখনো সবার হ্যাংওভার রয়েছে।', আকাশে হেসে বলল।
হঠাৎ সৌগতর কী একটা মনে পড়ে যেতে, ও জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা স্বর্ণালী, তুমি কালকে কী করে জঙ্গলের মধ্যে সবার আগে আগে রাস্তা চিনে যাচ্ছিলে? এসব রাস্তাঘাট চিনতে?আগে কবে এসেছিলে?'
'আগে? কই, আগে তো কখনো আসিনি!', স্বর্ণালী অবাক হয়ে বলল। অথচ গতকাল ওই বলেছিল, এখানে আগে এসেছে, সব চেনে, জানে। আর সত্যিই জঙ্গলের মধ্যে ওর হাঁটাচলা অদ্ভুত ভাবে বদলে গিয়েছিল। সত্যিই যেন ঐ জায়গাটা ও খুব ভাল করে চেনে বলে মনে হচ্ছিল। অথচ আজ সরাসরি অস্বীকার করছে। সৌগত বেশ অবাক হল। কালকে ঘরে ঢোকা অজানা নারীর অবয়ব, জঙ্গলের মধ্যে এক ঝলক দেখা আর গায়েব হয়ে যাওয়া মেয়েটা, তার ওপর মাঝরাতে দরজা নক করার ব্যাপারগুলো মিলিয়ে, ওর সন্দেহটা আরো বাড়িয়ে দিল। কে এসেছিল? তবে কি...?
ওদিকে অন্ধকার থেকে তখন আলো ফুটে উঠেছে। পাহাড়ের এক কোণে সূর্য উঠছে আর নিচের দিক থেকে মেঘ আর ছোট ছোট পাহাড়ের চূড়ার মধ্যে সেই আলোর হাল্কা বিচ্ছুরণ দেখে মনে হচ্ছে যেন সমুদ্রের ঢেউ উঠছে। এক অপার্থিব, অবর্ণনীয় দৃশ্য। তারই মধ্যে হঠাৎ উজ্জ্বল সোনালী রঙে জ্বলে উঠে দৃশ্যমান হয়ে উঠল কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জ। পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কিছু আছে বলে ওদেরতখন মনে হচ্ছিল না। ওরা মুগ্ধ, নিশ্চুপ হয়ে প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য দেখে মোহিত হয়ে যাচ্ছিল।
ব্রেকফাস্ট শেষে ফেরার পালা। হঠাৎ সৌগতর বিদ্যুৎচমকের মত একটা কথা মনে পড়ে গেল। সাদাকালো সোয়েটারটার কথা। কাল জঙ্গলে আবছাভাবে ওর মনে হয়েছিল স্বর্ণালীর সঙ্গের মেয়েটা, যে জঙ্গলে হঠাৎ গায়েব হয়ে গেল, তার গায়ে একটা সাদাকালো সোয়েটার ছিল। অথচ ঠিক এইরকমই একটা সোয়েটার তন্দ্রা পড়ত না? হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিকই তো। ওর সব স্পষ্ট মনে পড়ে গেল। সাদাকালো বড় বড় স্ট্রাইপওলা ফুলহাতা সোয়েটারটা তন্দ্রাকেই পরতে দেখেছিল ও শীতকালে। সৌগত মজা করে বলত, 'তুমি কি জেব্রা?' তাহলে এর মানে কী দাঁড়াচ্ছে? তন্দ্রা এসেছিল?একটা ঠান্ডা অনুভূতির স্রোত নেমে গেল সৌগতর শিরদাঁড়া বেয়ে। এই ঠান্ডাতেও ও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামতে লাগল। তবে কি সত্যিই কাল তন্দ্রা এসেছিল? জঙ্গলে, ঘরের মধ্যে? রাতেও কি খাদের দিক থেকে ওই এসে জানালায় নক করেছিল? কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব?সৌগত ভাবতে লাগল। কেনই বা ও ফিরে এসেছিল?ওকে কি কিছু বলতে চায়?তবে কি তন্দ্রা ওর পিছু ছাড়েনি?ওকে শাস্তি দিতে চায়?কিন্তু... কিন্তু তন্দ্রা তো মরে গেছে। না, না, এসব নিশ্চয়ই ওর মনের দুর্বলতা, মনের ভুল। ও সব ভুল ভাবছে। কিন্তু তাই বা কী করে হয়? ও তো একা নয়! ডিকিও জঙ্গলে অন্য মেয়েটাকে দেখেছিল। সিক্তাও শুনেছিল জানালায় নক করার শব্দ। স্বর্ণালীকে কাল অন্যরকম লাগছিল কেন? অথচ স্বর্ণালী আজ সব অস্বীকার করছে। সৌগতর কাছে পুরো ব্যাপারটাই একটা ধোঁয়াশা হয়ে রয়ে গেল।
ফিরে আসার সময় গাড়িতে বসে, সৌগতর দূরের পাহাড় আর জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হল, ওকে নিজেকে বদলাতে হবে। নইলে ও কোনদিন মুক্তি পাবে না, ওকে বদলাতেই হবে। হঠাৎ আদর করে সিক্তার চুলে হাত বোলাতে লাগল ও। জীবনে প্রথমবার ওর কাউকে মন থেকে ভাল লাগছে। সৌগতর চোখে জল এসে গেল।
জানলা
ন'য়ের দশকের উত্তর কলকাতার কথা। বাবলুর পাড়ায় ভাল ছেলে বলে বেশ সুনাম ছিল। পড়াশোনাতে তো ও ভাল ছিলই, নামী স্কুলে স্ট্যান্ডও করত। তার ওপর খুবই ভদ্র সভ্য ছিল, ওর নামে কোন অভিযোগ পাড়ায় কেউ কখনো শোনেনি। তাছাড়া ফুটবল-ক্রিকেট দুটোতেই ও বেশ ভাল ছিল, চুটিয়ে খেলত। তার বাইরে ছবি আঁকা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা এসব নিয়ে বাবলু বেশ মেতেছিল। ওর বাবা রঞ্জনবাবু সরকারি অফিসে চাকরি করতেন। আর মা সোমাগিন্নি বাবলুর সবদিকে খুব নজর রাখতেন। যাতে ও বখে যেতে না পারে, বাজে কোন বন্ধু বা নেশা না হয়। তবে স্কুলের আর কোচিংয়ের পড়ার চাপ সামলাতেই বাবলুর দিন কাবার হয়ে যেত।
এই বাবলুর জীবনেই হঠাৎ একটা পরিবর্তন এল। তখন ও ক্লাস টেনে পড়ে। ওদের বাড়ির পিছনেই ছিল বিপ্লববাবুদের বাড়ি। ওনার মেয়ে রাকা ছিল একেবারে ডানাকাটা পরী। ও'ও কাছেই একটা মেয়েদের স্কুলে ক্লাস টেনে পড়ত। বাবলুর নজর গিয়ে পড়ল রাকার ওপর। ওর পড়ার ঘরের জানলার বাইরে তাকালেই রাকার পড়ার ঘর দেখা যেত। রাকা সেই ঘরে শুয়ে, বসে, নানা পোজে পড়াশোনা বা অন্যান্য কাজ করত। আর বাবলু নিজের ঘরের খোলা জানলা দিয়ে সর্বক্ষন রাকার দিকে নজর রাখত। রাকা অবশ্য তাতে বিশেষ আমল দিত না, হয়ত খানিকটা উপভোগই করত। মাঝে মাঝে দুজনে চোখাচোখি হয়ে গেলে, বাবলু লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিত বা জানলার কাছ থেকে সরে যেত। রাকা সব বুঝেও বিরক্ত হত না, কারণ ওরও ততদিনে বাবলুর প্রতি একটা আকর্ষণ জন্মেছিল। তবে লাজুক বাবলু রাকাকে দেখে, যাকে বলে একেবারে ফিদা হয়ে গেল। বাবা অফিসে বেরিয়ে গেলে আর মা ঘরের কাজে বা বাজার দোকান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেই, বাবলু নিজের পড়ার ঘরের জানলার বাইরে রাকার ঘরে কখন ওকে একটু দেখা যাবে, তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকত।
রাকা ছিল একটু বহির্মুখী এবং ছটফটে টাইপের মেয়ে। ও ছিল বাবলুর থেকে অনেক বেশি স্মার্ট। ওর ক্লাসে বহু বয়ফ্রেন্ড ছিল, প্রতিদিনই কোন না কোন ছেলে ওকে স্কুলে বা রাস্তাঘাটে প্রেমপত্র দিত। রাকা অবশ্য সে সবে ভ্রুক্ষেপ করত না। কিন্তু বাবলুর এইভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে আড়চোখে ওকে দেখাটা ও মনে মনে ভীষণ চাইত। খোলামেলা পোশাক পরে, পড়ার ঘরে বাবলুকে দেখিয়ে দেখিয়ে ও নিজের কাজকর্ম করে যেত। কখনো বা খোলা জানলার বাইরে হাত বা পা ঝুলিয়ে দিত। রাকার ভরাট শরীরের বিভঙ্গে, মাদকতায় বাবলুর শরীরে জ্বালা ধরত, কিন্তু মুখে কিছু বলার সাহস পেত না। জানলা দিয়ে কখনো কোন আকার-ইঙ্গিতও করত না, নীরব দর্শক হয়েই থাকত। রাকার টগবগে হাবভাব, সাহসী চালচলন, ফটফট করে কথাবার্তা দেখে ওকে একটু ভয় আর সম্ভ্রমই করত বাবলু।
রাকার সঙ্গে বাইরে কখনো দেখা হয়ে গেলেও বাবলু বিশেষ কিছু কথা বলতে পারত না। হয় লজ্জায় সিঁটিয়ে থাকত, নয়তো মুখ লুকিয়ে পালিয়ে যেত। রাকার আগুনে রূপ, চলন-বলন দূর থেকে মোহিত হয়ে দেখতেই ও ভালবাসত। কখনো সামনাসামনি হবার মতো ওর বুকের পাটা ছিল না। কৈশোরের দামাল প্রেম বুকে করে এইভাবেই কেটে গেল অনেকগুলো দিন।
সারাবছর বিশেষ কথাবার্তা না হলেও, পাড়ার স্পোর্টস, পঁচিশে বৈশাখ, পুজো-আচ্চা বা কোন অনুষ্ঠানে দেখা হলে, দুজনে অল্পস্বল্প কথা হত। সবই পড়াশোনা নিয়ে বা সাধারণ কথাবার্তা। রাকার সামনে বাবলু কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারত না। অন্যদিকে রাকা ছিল ভীষণ প্রগলভ, বাবলুকে মাঝে মাঝেই বিড়ম্বনায় ফেলে দিত। একদিন রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠানে, রাকা বাবলুকে পাকড়াও করে বলল, 'এই তুই খালি গায়ে জানলার সামনে রোজ দাঁড়াস কেন রে? মাসল্ দেখাস?' 'না, না' বলে লজ্জা পেয়ে মাটিতে যেন মিশে গেল বাবলু। 'শোন, ওই ব্লু স্যান্ডো গেঞ্জিটায় না তোকে হেব্বি মানায়। ওটা বেশি পরিস না কেন?', রাকা বলেছিল। বাবলু অবাক হয়ে রাকার চোখে চোখ রেখেছিল। রাকার চোখদুটো কী সুন্দর! এই চোখ কি কোনদিন ওর হবে? মনে মনে সে কথা ভাবতেই, রাকা যেন কীভাবে তা টের পেয়ে গেল। মুহূর্তে বদলে গেল ওর দৃষ্টি। চোখ নামিয়ে নিয়ে আস্তে আস্তে অন্য দিকে সরে গেল। বাবলুও অন্য বন্ধুদের কাছে চলে গেল। কেউ শুনতে পায়নি ওদের কথাবার্তা।
আরেকবার দোকান থেকে বাবলু খাতা-পেন কিনে গলি দিয়ে ফিরছে, হঠাৎ রাকার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা। বাবলু একটু হেসে সাইড হয়ে যাবে ভেবেছিল, কিন্তু পারল না। পাশ দিয়ে যাবার সময়, রাকা ইচ্ছে করে ওর হাত দিয়ে বাবলুর হাতটা ছুঁয়ে দিয়ে চলে গেল। বাবলু ঘুরে তাকাতে রাকাও ঘুরে দেখেছিল। সে দেখার কী মানে, বাবলু তখন বোঝেনি। একটু অবাক হয়েছিল। সেই সঙ্গে সারা পৃথিবীর সমস্ত ভাললাগায় ভরে গিয়েছিল ওর মন। প্রথম স্পর্শ, সে রাতে ভাল করে ঘুম হয়নি বাবলুর।
আরো একদিনের কথা। বাবলু কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হেঁটে কোচিং যাচ্ছিল। ক্যাসেট কিনবে বলে ও রিস্কাভাড়ার টাকা বাঁচাত। ওদিকে রাকাও একটা রিক্সা করে অন্য কোন কোচিংয়ে যাচ্ছিল। সেদিন রিকশায় বসে রাকা ঘুরে বাবলুর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়েছিল। কিছু কি বলতে চেয়েছিল? না, বাবলু সেটাও বুঝতে পারেনি।
তবে একবার রাকা সত্যিই কিছু জানিয়েছিল, তবে লিখে। সেবার একটা টেস্টপেপার নিতে বাবলু রাকাদের বাড়ি গিয়েছিল। রাকা টেস্টপেপারটা বাবলুকে দিয়ে বলেছিল, 'ক'দিন পরেই ফেরত দিস কিন্তু।' 'হ্যাঁ হ্যাঁ', বলে বাবলু সেটা নিয়ে বাড়িতে চলে এল। পাতাগুলো উল্টোতে উল্টোতে হঠাৎ ওর চোখ চলে গেল শেষ পাতায়। সেখানে গ্রে স্ট্রীটের একটা বাড়ির ঠিকানা দিয়ে, দিন তিনেক পরে বিকেল পাঁচটায় যাবার কথা লেখা আছে। রাকা কি এটা ওকে উদ্দেশ্য করেই লিখেছে? ঐদিন ঐ সময় ঐ জায়গায় রাকা কি ওর জন্য অপেক্ষা করে থাকবে? বাবলু ঠিকমতো বুঝতে পারল না। ও আর সেখানে যায়নি। কী করে যাবে? বাড়িতেই বা কী বলবে? তাছাড়া ঠিকানাটা যে বাবলুর মামারবাড়ির আট-দশটা বাড়ি পরেই! কিছুদিন পরে অবশ্য ও মামারবাড়ি যাওয়ার সময় দেখেছিল, সেটা যাদের বাড়ি তাদেরও পদবী মিত্র, রাকার মতোই। হতেও পারে ওদেরই কোন আত্মীয়ের বাড়ি। আর রাকা হয়ত সত্যিই সেদিন ওখানে এসেছিল, আর সেজন্যই বাবলুকে আসতে বলেছিল। কিন্তু সেকথা আর জানা হল না। দোলাচলেই কেটে গেল দিনগুলো।
তবে রাকার সঙ্গে ওর সবচেয়ে অর্থবহ কথাবার্তা একবারই হয়েছিল। সেদিন দুপুরে কোন কারণে স্কুল আগেভাগে ছুটি হয়ে গেছিল। ফেরার সময় পাড়ার মুখেই রাকার সঙ্গে দেখা। ও'ও স্কুল থেকেই ফিরছিল। লাল-সাদা স্কুল ড্রেসে ওকে অন্যরকম লাগছিল, ভীষণ সুন্দর। বাবলুর পাশে এসে রাকা আস্তে আস্তে বলেছিল, 'ছোটগেটে আয়।' তারপর দূরে সরে গিয়েছিল। বাবলু প্রথমে বুঝতে পারেনি ব্যাপারটা। রাকা কী বলল? ওকে বলল? ওর প্রথমে বিশ্বাসই হয়নি। ছোটগেটেই বা কেন যেতে বলল? ছোট গেট মানে তো পুকুর ধারে যাওয়ার গেটটা। ওদিকটা এসময় শুনশান থাকে, বাবলু জানে। কিন্তু যেতে ওর ঠিক সাহসে কুলোল না। দোনামনা নিয়ে বাড়িতে ঢুকে গেল। কিন্তু তারপরেই ওর বারবার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, ছোটগেটে গিয়ে একবার দেখে, ব্যাপারটা কী। কিন্তু ফেরার পরেই আর বাড়ি থেকে মা বেরোতে দিলেন না। মার কড়া শাসন, তাছাড়া ও নিজেও ভীতু প্রকৃতির ছিল যে। মা বললেন, 'স্কুল থেকে এসে আবার এখুনি কোথায় বেরোচ্ছিস রে?' 'এই একটু বাপ্পাদের বাড়ি যাব।' 'এই ভরদুপুরে? যা জামাকাপড় ছেড়ে হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসে যা।' মার বকুনি শুনে আর বাড়ির বাইরে বেরোবার ক্ষমতা হয়নি বাবলুর। ছোটগেটেও যাওয়া হয়নি। জানাও হয়নি কী অপেক্ষা করেছিল ওর জন্য।
এদিকে পুজো এসে গেল। প্রতিবছর পাড়ার মাঠে ছেলে-বুড়ো সকলে মিলে একজোট হয়ে, হৈ হৈ করে পুজো হয়। বড়দের মিটিং, মায়েদের আলাদা মিটিং চলছে। বাবলুরা সবাই মিলে চাঁদা তুলতে বেরোল। সব জোগাড়যন্ত্রে এগিয়ে এল বাড়ির মা-বৌরা। আর সবচেয়ে আনন্দ ছোটদের। প্যান্ডেল বাঁধার কাজ শুরু হতেই, তাদের উৎসাহের আর অন্ত রইল না। ওদিকে স্কুলও ছুটি পড়ে গেছে। কিন্তু ক'দিন ধরে রাকাদের বাড়িতে কাউকে দেখা গেল না। ওরা নাকি দার্জিলিং বেড়াতে গেছে। বাবলু শুনে একটু মুষড়ে পড়ল। রোজ জানলা দিয়ে রাকার চেহারাটা না দেখতে পেলে, ওর যেন তখন আর দিন কাটে না। অবশেষে ঠিক সপ্তমীর দিন সকালে রাকারা ফিরে এল। দেখে ধড়ে প্রাণ এল বাবলুর। যাক, পুজোটা অন্তত আর বাজেভাবে কাটবে না।
সন্ধেয় বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে রাকাদের সঙ্গেও দেখা হয়ে গেল। ওদের মেয়েদের গ্রুপটাকে দূর থেকে ফলো করতে লাগল বাবলুরা। রাকা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বারবার পিছনে ফিরে তাকাচ্ছিল। ওদের সঙ্গে সঙ্গেই একই প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরা, একই দোকানে ফুচকা-ঝালমুড়ি-এগরোল খাওয়া, আর তার সঙ্গে একই পথ প্রায় একসঙ্গে হেঁটে চলল বাবলুরা। তার সঙ্গে বারবার তাকানো রাকার চোখের দিকে। রাকার বন্ধুরা সব বুঝতে পেরে, রাকাকে খুব উস্কাচ্ছিল। আবার বাবলুর বন্ধুরাও বাবলুকে আওয়াজ দিচ্ছিল। বাবলুর একটু লজ্জা করছিল, কিন্তু কিছুতেই রাকার সঙ্গ ছাড়তে চাইছিল না। রাকা সব বুঝেও ব্যাপারটায় প্রশ্রয় দিচ্ছিল। তার মানে কি রাকাও মনে মনে বাবলুকে পছন্দ করে? বাবলুর বুকে কে যেন হাতুড়িপেটা করছিল। রাকা কি সত্যিই ওর প্রেমিকা হবে?
সেই রাতে বাবলু সারারাত বিছানায় শুয়ে শুয়ে খালি রাকার কথাই ভাবছিল আর ছটফট করছিল। আনন্দে, উত্তেজনায় ওর ঘুম আসছিল না। ভোরের দিকে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল আর তখনই সুখস্বপ্নে আবার এসে হাজির রাকা।
'কী রে! তুই কিছু কথা বলিস না কেন আমার সঙ্গে?'
'কী আর বলব? আমি তো আমার সব কথাই তোকে বলে ফেলেছি।'
'কখন বললি? তুই তো আমাকে দেখলেই কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যাস। তাই আমিও আর তোকে আমার মনের কথাগুলো বলতে পারি না।'
'তুই মুখে না বললেও, আমি কিন্তু তোর মনের সব কথাই শুনতে পাই।'
'সে কী রে? তুই কি টেলিপ্যাথি জানিস নাকি?'
'ধুস্ । আসলে আমার মন তোর মনকে বোঝে।'
'ও, কিন্তু সামনাসামনি কবে বলবি বল তো আমাকে?'
'এখনই বলব। বল, কী শুনতে চাস?'
'জানি না।'
সারা রাতের স্বপ্নের রেশ মেখে পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতেই, যথারীতি জানলার বাইরে রাকা। তবে এবার একটু সাবধান হয়ে গেল বাবলু। বেশি বাড়াবাড়ি করলে রাকা ওকে সস্তা, খারাপ ছেলে ভাববে। তাছাড়া বাবা-মা সব জেনে গেলে তো একেবারে বিপদের একশেষ। এর আগে একদিন মা বাবলুকে হাঁ করে জানলা দিয়ে রাকাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে, ভীষণ বকেছিলেন। জানলা বন্ধ করে, আলো জ্বেলে পড়তে বলেছিলেন। 'খুব পাকা হয়ে গেছিস, না রে?', বলে ছেড়ে দিয়েছিলেন সেবার। রাকাও বোধহয় সেবার এরকমই বকুনি খেয়েছিল। ওদের বাড়ি থেকেও চিৎকার-চেঁচামেচি, কান্নাকাটির আওয়াজ পেয়েছিল বাবলু। তারপর ক'দিন রাকাদের বাড়ির ওই জানলাটা বন্ধই ছিল। পরে অবশ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব আগের মত হয়ে গেছে। তবে এবারে আর রিস্ক নিতে চায় না বাবলু। বাবলুর আর রাকার বাবা দুজনেই বেশ ভাল পাড়াতুতো বন্ধু। দুজনে প্রায়ই আড্ডা হয়, বাড়িতে আসা যাওয়াও আছে। তবে বাবলুর মা আর রাকার মা অতটা বন্ধু নয়। দেখা হলে শুধু মুখের কোনে হাসি আর 'কেমন আছেন', 'ভাল আছি' গোছের নিয়ম-রক্ষার কথাবার্তা হয় মাত্র। সব জানে বাবলু। একটু বেচাল হলেই দুটো জানলা চিরকালের মতো বন্ধ হয়ে যাবে। তখন যে কী হবে, বাবলু ভাবতেই পারে না। রাকাকে না দেখে ও থাকবে কী করে?
সেদিন অষ্টমী। প্যান্ডেলে অঞ্জলি দিতে গেল বাবলু। বাবা-মাও গেলেন সঙ্গে। ওর চোখ কিন্তু খুঁজে বেড়াচ্ছিল রাকাকে। কই, রাকা তো এখনো এল না! বাবলু ঠিক করল, ওর সঙ্গেই আজ একসঙ্গে অঞ্জলি দেবে, আলাদা নয়। বাবা-মা বারবার ডাকলেও, নানা বাহানায় তাই ও এড়িয়ে গেল। ওদিকে ব্যাচের পর ব্যাচ অঞ্জলি হয়ে যাচ্ছে। রাকার বাবা-মাও অঞ্জলি দিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু রাকা কোথায়? ওদিকে শেষ ব্যাচের অঞ্জলির জন্য মাইকে ডাকা হচ্ছে। বাবলু ছটফট করতে লাগল। আর ঠিক তখনই ও চমকে উঠল। রাকা শাড়ি পড়ে ধীর পায়ে হেঁটে আসছে প্যান্ডেলে। খোলা চুল, চোখে অল্প কাজল, গোলাপি ঠোঁট। কী সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে তো ওই। বুকে দামামা বাজতে লাগল বাবলুর।
অঞ্জলি শুরু হয়ে গেল। রাকার পাশে দাঁড়িয়েই অঞ্জলিটা দিল বাবলু। কচি কলাপাতা রঙের পাঞ্জাবি-পায়জামা আর হালকা সানগ্লাসে বাবলুকেও দারুন দেখাচ্ছিল। রাকা যেন আজ একটু অন্যরকম। লজ্জা লজ্জা ভাব করে বাবলুর দিকে বারবার ফিরে ফিরে আড়চোখে দেখছিল। শেষে বলে উঠল, 'ফুল নিবি না? এই নে ফুল।' বলে বাবলুর হাতে অঞ্জলীর জন্য একগাদা ফুল দিয়ে দিল। বাবলু দু'হাতে ফুল নিয়ে হাত দুটো জোড়া করতে যাবে, হঠাৎ চোখে পড়ল হাতের ফুলের গোছার মধ্যে এক টুকরো কাগজ। রাকা চিঠি দিয়েছে? বুকটা ধক ধক করতে লাগল ওর। সাবধানে কাগজটা পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে নিল বাবলু। অঞ্জলি দিতে দিতে দুজনে বারবার দেখছিল দুজনকে। মা দুর্গাকে অঞ্জলির সঙ্গে সঙ্গে, বাবলুর কিছুটা যেন ভালবাসার অঞ্জলি চলে যাচ্ছিল রাকার দিকেও। ওর মনের দেবী তো রাকাই।
অঞ্জলি শেষ হতে, বন্ধুদের ডাক অগ্রাহ্য করে, প্যান্ডেলের পিছনে গিয়ে বাবলু চিঠিটা পড়বে বলে ঠিক করল। কিন্তু সেখানে গিয়ে পাঞ্জাবির দু'পকেট হাতড়িয়েও কাগজটা কোথাও খুঁজে পেল না, পকেট ফাঁকা। কোথায় গেল চিঠিটা? পড়ে গেল নাকি? বাবলু পাগলের মত পাঞ্জাবির পকেটগুলো খুঁজতে লাগল, নেই। অথচ ওর পরিষ্কার মনে আছে কাগজটা ও বাঁ পকেটেই ঢুকিয়েছিল। ইস্ , নিশ্চয়ই ভিড়ের ঠেলাঠেলিতে পাঞ্জাবির ঝোলা পকেট থেকে কোথাও পড়ে গেছে। উৎকণ্ঠায় পাগলের মত প্যান্ডেলে ফিরে গেল বাবলু। রাকা ততক্ষনে ওর অন্য বান্ধবীদের সঙ্গে আড্ডায় ব্যস্ত। বাবলুর বন্ধুরাও ওদের আড্ডায় বাবলুকে বারবার ডাকছে, বিকেলে ঘুরতে যাবার প্ল্যান হবে। বাবলুর তখন আর কোথাও মন নেই। ও প্যান্ডেলের ভেতর আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে লাগল কাগজের ছোট্ট টুকরোটা। যেখানে দাঁড়িয়ে অঞ্জলি দিয়েছিল তার আশেপাশেই কোথাও পড়ার কথা। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে ধুলোর মধ্যে ও পেয়ে গেল কাগজটা, তেমনি ভাঁজ করা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। মুহূর্তে সেটা কুড়িয়ে নিল ও, সেই সাত রাজার ধন এক মানিক। তর সইতে না পেরে, ওখানে দাঁড়িয়েই উত্তেজনার বশে পড়ে ফেলল সেটা। গোটা গোটা সুন্দর হাতের লেখায় কয়েকটা মাত্র শব্দ লেখা আছে তাতে। 'চারটের সময় ক্লাবঘর'। মানেটা বুঝতে আর অসুবিধা হল না ওর। রাকা দেখা করতে চেয়েছে। ওর বুকটা আনন্দে উত্তেজনায় ধক ধক করতে লাগল। ঐ সময় ক্লাবঘরে ভোগ খাওয়া শেষ হয়ে যায়, কেউ থাকে না।
ওদিকে বাবলুর খোঁজাখুঁজি, কাগজ কুড়োনো, সব দেখতে পেয়ে গেছল ওর প্রিয় বন্ধু হাম্পু। ও এসে জিজ্ঞেস করল, 'কী রে? কী ব্যাপার বল তো? তখন থেকে এখানে কী খুঁজে চলেছিস?' 'না না, কিছু না।', বলে কাটিয়ে দিতে চাইল বাবলু। কিন্তু হাম্পুর চোখে ঠিক ধরা পড়ে গেল। 'কিছু না বললেই হল? হাতে ওটা কী লুকোলি, দেখা। রাকা চিঠি দিয়েছে, না?' তখন আর প্রিয় বন্ধুকে না বলে থাকতে পারল না বাবলু। 'হ্যাঁ, পরে সব বলব। এখন চুপচাপ থাক।', বাবলু অনুরোধ করল। 'ঠিক আছে, চল।', হাম্পু অভয় দিল। দুজনে গলায় গলায় বন্ধু। একজন আরেকজনের সব খবর রাখে। হাম্পুর তাই পুরো ব্যাপারটা বুঝতে কোন অসুবিধা হল না। ও জানে বাবলুর রাকার প্রতি ক্রাশের ব্যাপারটা। গতকাল কীভাবে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে, স্টলে স্টলে ধাওয়া করেছিল। ও'ও তার সাক্ষী ছিল। সুতরাং দুয়ে দুয়ে চার করতে অসুবিধাটা কোথায়?
বুকে আনন্দটা চেপে রেখেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মেরে কাটল সকালটা। বন্ধুদের অনেকে টিপ্পনি কাটল রাকার সঙ্গে ওর প্রেমের ব্যাপারটা নিয়ে। 'এই তোরা আজকে কাগজ পড়েছিস?', বলে হাম্পুও অর্থবহ কিছু ইঙ্গিত দিল, যার মানে শুধু বাবলুই বুঝল। চোখ গোল গোল করে বকতে লাগল হাম্পুকে। না হলে সব ফাঁস করে দেবে। ওদিকে অন্য বন্ধুরা বাবলুকে বারবার বারণ করতে লাগল। বাপ্পা বলল, 'দেখ বাবলু, পাড়ার মধ্যে এসব ভাল না। পাড়ার বদনাম হয়ে যাবে। এসব করিস না।' ইত্যাদি। সুদীপ বলল, 'সোনালীও সেদিন বলছিল। তোদের ব্যাপারটা সবাই জেনে গেছে। পাড়ার মধ্যে কেস খেলে খুব খারাপ হবে রে বাবলু।' বাপ্পা আরো বলল, 'কৌশিকদা সেদিন বলছিল, রাকা নাকি তোর ব্যাপারে কী সব জানতে চাইছিল। কৌশিকদা সরাসরি ওকে আর ইন্টারেস্ট না দেখাতে বলে দিয়েছে। তা ছাড়া কৌশিকদা এটাও বলল, রাকা নাকি তোর থেকে বয়সে কিছুটা বড়। সুতরাং তুই আর এগোস না রে বাবলু।' এ সবের মধ্যে একমাত্র হাম্পুই বাবলুর পক্ষ নিল। 'কেন রে? মিন্টুদা, স্বপনদা সবাই তো পাড়ার মধ্যেই প্রেম করেছিল। তখন তো কেউ কিছু বলেনি। যত দোষ শুধু বাবলুর বেলায়?' শুনে সবাই চুপ করে গেল। তারপর কথাবার্তা অন্য দিকে ঘুরে গেল। আড্ডা, ইয়ার্কি আর হৈ হৈ তে মেতে উঠল সবাই। একটা নাগাদ আড্ডা শেষে যে যার বাড়িতে চান করতে গেল। আধঘন্টা পরেই ক্লাবঘরে আবার সবাই আসবে ভোগ খেতে। ওদিকে হাম্পু নাছোড়বান্দা। ও বাবলুর পিছন পিছন আসতে লাগল। 'কী রে চলে যাচ্ছিস যে বড়? চিঠিটা দেখাবি না?', হাম্পু ছাড়বার পাত্র নয়। বাধ্য হয়েই সেটা দেখাতে হল বাবলুকে। হাম্পু বলল, 'ঠিক আছে, চলে আসিস সময়মতো। আমিও চলে আসব।' 'তুই! তুই আবার কেন আসবি?', বাবলু অবাক। 'দুর ব্যাটা! আমি তোদের কাবাবমে হাড্ডি হতে আসব না রে। সবদিকে নজর রাখতে হবে না?' হাম্পু বোঝায়। 'মানে?', বাবলু তখনো কিছু বুঝতে পারে না। ' আরে এদিকে তখন যদি কেউ এসে যায়? দেখে ফেললে কী হবে? আমি পাহারা দেব। তোকে কোন চিন্তা করতে হবে না।' 'ও আচ্ছা।' বাবলু এবার নিশ্চিন্ত হল। 'এই না হলে তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড?' ও হাম্পুর কাঁধে হাত দিয়ে জড়িয়ে বলল। 'থাক থাক। কী কথা হল, সব বলবি কিন্তু। আর বিপদ দেখলেই আমি সিটি দেব। তখন তোরা দুজনে পুকুর ধার দিয়ে ঘুরে যে যার বাড়ি চলে যাবি। কেউ বুঝতেও পারবে না।' 'গুড আইডিয়া। ওঃ, তুই না থাকলে যে কী হত!', বাবলু হাম্পুর পিঠ চাপড়ে দিল। 'উফ্', পিঠে হাত ঘষতে ঘষতে হাম্পু চলে গেল। বাবলু জানে, হাম্পু ওকে ভীষণ ভালবাসে। সব সময় ওর পাশে থাকে, সাহায্য করে। হাম্পুর অবশ্য নিজের কোন গার্লফ্রেন্ড নেই। একবার শুধু পারমিতা বলে একই কোচিংয়ের একটা মেয়েকে ওর ভাল লাগত। খুব চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু পরে জানতে পারে পারমিতা এনগেজড। আসলে হাম্পুর চেহারাটা একটু মোটার দিকে। কোন মেয়ে তাই সেভাবে ওকে পাত্তা দেয় না। কিন্তু তাতে ওর কোন দুঃখ নেই। বাবলুর খুশিই ওর খুশি।
ঠিক তিনটের সময় ক্লাবঘরে ভোগ খাওয়া শেষ হয়ে গেল। বন্ধুদের সঙ্গে বসে খিচুড়ি, ছ্যাঁচড়া, পায়েস, চাটনি, পাঁপড় আর বোঁদে সবাই চেটেপুটে খেল। রাকাও ওর বান্ধবীদের সঙ্গে খেতে বসেছিল। দূর থেকে চোখাচোখি হলেও কথা বলার সুযোগ হয়নি দুজনের। না হোক, বিকেলে তো দেখা হচ্ছেই।
কিন্তু কপাল খারাপ, ঠিক তিনটের পরেই কোথা থেকে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করল। তারপরে মুষলধারে বৃষ্টি। বাবলু বাড়িতে বসে বসে উত্তেজনায় বারবার ঘড়ি দেখছিল। সাড়ে তিনটে, পৌনে চারটে, চারটে বাজল। বৃষ্টি তত বাড়ছে, কমবার নাম নেই। শেষে মরিয়া হয়ে বাবলু ছাতা নিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। বাড়িতে কোনরকমে ভুজুং ভাজাং দিয়ে বলল, 'প্যান্ডেলে জল ঢুকছে, আমাকে এখনই একবার যেতে হবে। বেরিয়েই বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতেই ও ক্লাবঘরের দিকে চুপিসাড়ে হাঁটা দিল। ক্লাবঘর শুনশান, তালা দেওয়া। বৃষ্টির মধ্যেই সাড়ে চারটে পর্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করল বাবলু। কিন্তু কেউ এল না। শেষে বিরস বদনে ও বাড়ি ফিরে গেল। ফিরতেই যথারীতি একপ্রস্থ বকুনি খেল মার কাছে। ও কিছু না বলে চুপচাপ নিজের ঘরে শুয়ে শুয়ে ওয়াকম্যানে মান্না দের ক্যাসেটটা লাগিয়ে গান শুনতে লাগল। 'কতদূরে আর নিয়ে যাবে বলো'। ওর মনটা ভেঙে গিয়েছিল। রাকার চিরকুট পেয়ে, কত আশা নিয়ে আজ দেখা করতে গিয়েছিল। ওদের প্রথম ডেট। অথচ কথা দিয়েও রাকা এল না! ছাতা নিয়ে কি একটু আসতে পারত না? বাবলু আর ভাবতে পারল না। প্রথম প্রেমের যন্ত্রণা যে কী, সেটা ও তখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল।
হাম্পু ঘুমচোখ রগড়াতে রগড়াতে সন্ধেবেলায় প্যান্ডেলে এসে জিভ কেটে বলল, 'সরি ভাই, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম রে। তাই আসতে পারিনি।' 'অনেক করেছিস, ঘুমকাতুরে কোথাকার।', বাবলু রেগে বলল। 'রাগছিস কেন গুরু? কী হল বল না। রাকা এসেছিল?' 'ধুর, আসতেই পারেনি। বৃষ্টিটা হবার আর সময় পেল না?', বাবলু ব্যাজার মুখে বলল। 'তাই নাকি? বৃষ্টি হচ্ছিল বুঝি?', নির্লিপ্তভাবে বলল হাম্পু। 'তুই কী রে?', বাবলু রেগে বলল। 'না, আমি ভাবছি রাকা এল না কেন।', হাম্পু চিন্তিতভাবে বলল। 'সেই তো! চিরকুটটাই বা তবে দিল কেন? ও কি সত্যিই বৃষ্টির জন্য আসতে পারল না? নাকি মত বদল করল?', বাবলু আকুলভাবে বলল। ওর চোখ মুখে তখন ভীষণ কষ্ট লেগে আছে, যেন কেঁদেই ফেলবে। হাম্পু ওর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, 'ভাবিস না। আজ আসতে পারেনি তো কী হয়েছে? পরের দিন হবে। এবারে তুই ওকে চিঠি দিবি। কালই। বুঝলি?' 'হুঁ, তাই ভাবছি।', চোখ-মুখ আবার উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বাবলুর। 'কিন্তু কীভাবে জানাব ওকে?' 'দাঁড়া, ভেবে দেখছি। ঠিক একটা বুদ্ধি বের করব। এখন ঠাকুর দেখতে বেরোবি তো? নর্থের দিকটা তো ঘোরাই হয়নি।' সেদিন বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ঠাকুর দেখতে যাওয়া, সবকিছুই করল বাবলু। কিন্তু তালটা যেন একটু কেটে গেল।
রাকার দেওয়া সেই ফুল আর চিরকুট বাবলু জয় গোস্বামীর 'কবিতাসংগ্রহ' বইয়ের ভেতরে লুকিয়ে রেখে দিল। বারবার লুকিয়ে লুকিয়ে ওই তিন শব্দের চিরকুটটা কতবার যে পড়ল আর কতবার ফুলটার গন্ধ নিল, তার শেষ নেই। ফুল আর চিরকুটটা ওর প্রথম প্রেমের চিহ্ন, কত ভালবাসা লেগে আছে ওতে। এগুলো কখনো কাছছাড়া করতে পারবে না ও, যত্ন করে রেখে দেবে।
পরের দিন নবমী। মনটা ভার হয়ে গেল বাবলুর। আজই শেষ পুজো। রাকার সঙ্গে এই পুজোয় আর কি দেখা হবে না? কিন্তু ওকে দেখা করার ব্যাপারটা জানাবেই বা কী করে? হাম্পুই ভরসা। দুই বন্ধুতে পরামর্শ চলল। শেষে হাম্পু বলল, 'আইডিয়া! রাকা যখন ভোগ খেতে বসবে, ওর কাগজের থালাটায় আগে থেকে লিখে রেখে দিবি। কী লিখবি তুই ঠিক করে নে।' 'ঠিক বলেছিস', বাবলু যেন হালে পানি পেল। এই না হলে হাম্পু। এত বুদ্ধি ধরে, বন্ধুদের এত ভাল ভাল আইডিয়া দেয়, অথচ নিজে এখনো একটা গার্লফ্রেন্ড জোটাতে পারল না!
পরিবেশনে প্রতিবার পাড়ার ছোট-বড় সকলেই অংশ নেয়। তবে কাগজের থালা দেওয়ার দায়িত্বটা এবার বাবলুকে নিতেই হবে। আর ঠিক যে থালাটা রাকাকে দেবে, সেটাতে আগে ভাগেই মনের কথাগুলো লিখে রাখবে। দেবার সময় হিসেব করে সেই থালাটা রাকার সামনে নামিয়ে দিলেই হল। আজ আবার এলাহি খাওয়া-দাওয়া। ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন আর গোলাপজামের মেনু।
প্ল্যান অনুযায়ী সব ঠিক হয়ে গেল। দুজন ছাড়া কেউ জানতেও পারল না। রাকার কাগজের প্লেটে বাবলু লিখে দিল, 'চারটের সময় ক্লাবে আসিস।' যথারীতি পরিবেশনের সময় সেটা নামিয়ে দিল রাকার সামনে। সেসময় ভীষণ টেনশন হচ্ছিল বাবলুর, রীতিমতো ঘামছিল। সবকিছু ঠিকঠাক হবে তো? প্লেটের লেখাটা দেখে রাকা একটু অবাক হয়ে বাবলুর দিকে তাকিয়েছিল। কিন্তু তারপরেই ওর পাতে পড়ে গেল ধোঁয়া ওঠা ফ্রায়েড রাইস। যাই হোক খাওয়া-দাওয়ার পর্ব মিটলে, বাবলু অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল। এক একটা মিনিট যেন কাটছেই না। উৎকণ্ঠায় পেরিয়ে গেল একটা ঘন্টা। চারটে বাজতে না বাজতেই নির্দিষ্ট জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে থাকল বাবলু। যাক বাবা আজ আর বৃষ্টি নেই। ক্লাব ঘরেও কেউ কোথাও নেই। বাড়িতেও কেউ আপত্তি করেনি। হাম্পু অন্যদিকে নজর রাখছে। বাবলু ঘন ঘন ঘড়ি দেখতে আর উশখুশ করতে লাগল।। ওদিকে চারটে বেজে গেল। চারটে পাঁচ, চারটে দশ। আর ঠিক তখনই হাল্কা নীল চুড়িদার আর সাদা ওড়নায় সন্তর্পনে এসে হাজির হল রাকা। আনন্দে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল বাবলু। কী বলবে ঠিক করতে পারল না প্রথমে। রাকাকে কী সুন্দর দেখাচ্ছে। সূর্যের পড়ন্ত আলো এসে পড়েছে ওর মুখে। প্রথম কথা রাকাই বলল, 'কী বলবি তাড়াতাড়ি বল। অনেক কষ্টে এসেছি।' 'আগের দিন আসিসনি কেন? আমি কতক্ষন দাঁড়িয়ে ছিলাম।' 'আগের দিন মা কিছুতেই বৃষ্টিতে বের হতে দিল না রে। কী করব বল।', মিষ্টি হেসে রাকা বলল। 'তোকে একটা জিনিস দেব বলে এনেছি। এই নে।', বলে একটা গোলাপ ফুল বুকপকেট থেকে বের করে রাকার হাতে দিল বাবলু। আজ সকালেই একটু দূরের একটা ফুলের দোকান থেকে বাবলু লুকিয়ে ফুলটা কিনে এনেছে। এতক্ষন ফুলটাকে যত্ন করে লুকিয়েও রাখতে হয়েছে। রাকা হাত বাড়িয়ে সেটা নিল, হাতে হাত ছুঁল। দুজনেরই হাত তখন কাঁপছে, মুখ দিয়ে কারো কথা সরছে না। শেষে রাকা বলল, 'তুই এত ভীতু কেন রে?' বাবলু কোন উত্তর দিল না। বরং মুগ্ধ চোখে দেখে যেতে লাগল। রাকাও বাবলুর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। বাবলু হঠাৎ রাকার একটা হাত ধরল। রাকা ছাড়িয়ে নিল না। মাথা নিচু করে শুধু বলল, 'এবার যেতে হবে।' বাবলু রাকার হাতটা আলতো করে ধরে, ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আবার কবে দেখা হবে?' 'কাল তো ভাসান। কাল সবাই থাকবে। তাহলে পরশু। একই সময়ে।', রাকা বলল। 'ঠিক আছে' বাবলু মৃদু স্বরে বলল। রাকা আস্তে আস্তে ওর হাতটা ছাড়িয়ে নিল। তারপর ঘুরে চলে যেতে লাগল। দু'পা গিয়েই একবার ঘুরে দাঁড়াল। তারপর একটা ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিল বাবলুর দিকে। তারপর দ্রুত চলে গেল। বাবলুর তখন অজ্ঞান হবার অবস্থা। ধাতস্থ হতে ওর একটু সময় লাগল। রাকা ওকে কিস দিল! ও তো ভাবতেই পারছে না। ওদিকে একটু বাদেই হাম্পু এসে হাজির। 'কী রে? কী কথা হল? বল না।' দুজনে গল্প করতে করতে হাঁটা দিল। কিন্তু বাবলুর মনে একটু আগের ঘটনার রেশটা তখনও লেগে ছিল।
সেদিন রাতেও বাবলুর ভাল ঘুম হল না। তার বদলে যা হল তা এক অদ্ভুত সুখস্বপ্ন। পাশবালিশটাকে জড়িয়ে চুমোয় চুমোয় অস্থির করে দিল ও। বাস্তবে যা পারে না, সেই সব অবদমিত ইচ্ছেগুলো পাশবালিশের ওপরই ঢেলে দিল। যেন রাকাকেই জড়িয়ে ধরছে। তারপর জেগে, ঘুমিয়ে, রাকাকে বুকে জড়িয়ে, ওর কল্পনা, সুখানুভূতি, ওর উপস্থিতি সবকিছু দুর্নিবার ভাবে ওর বুকে মিশে রইল সারারাত। এ যে কী ভাললাগা, কী আনন্দ, কী পাগলামি, তা কখনো কাউকে বোঝাতে পারবে না বাবলু। শুধু অসীম ভাললাগায় রাতটা কেটে গেল এপাশ-ওপাশ করে, পাশবালিশ জড়িয়ে আর বিছানা ধামসিয়ে।
ওদিকে পুজোর শেষ দিন এসে হাজির। সেদিন বিজয়া দশমী। সবারই মন খারাপ, মা দুর্গা চলে যাবেন। আবার এক বছরের অপেক্ষা। এত আনন্দময় দিনগুলো শেষ হয়ে গেল! বাবলুর মনটাও সকাল থেকে খারাপ। যথারীতি জানলাটা খুলে দিল ও। রাকাদের বাড়ি দেখা যাচ্ছে। একটু পরেই রাকা এসে হাজির হল। জানলা দিয়ে ওর পা দেখা যাচ্ছে যথারীতি। উরুর কিছুটা বেরিয়ে রয়েছে ফ্রকের ভেতর দিয়ে। যেদিন ও হটপ্যান্ট পরে সেদিন বাবলু জাস্ট দিবানা হয়ে যায়, ওর দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না । ওদিকে মা-বাবা অন্য ঘরে কী সব কথাবার্তায় ব্যস্ত। বাবলু প্রাণপণে রাকার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে যেতে লাগল। একটু পরেই রাকা জানলা দিয়ে মুখ বাড়াল। দেখে মনটা ভরে গেল বাবলুর। এই তো ওর প্রিয়তমা। কিন্তু কী করবে, কী বলবে ঠিক করতে পারল না ও। ইশারা ছাড়া আর কীই বা করার আছে!। ও'ও একটা ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিল রাকার দিকে। রাকা কপট রাগ দেখিয়ে, মুখ ভেংচাল। তারপর হাত মুঠো করে ওকে কিল দেখাল। এরকম ক'বার হবার পরে মা ঘরে এসে যেতে, বাবলুকে প্রেমালাপে ইতি টানতে হল।
বিকেলে মা-কাকীমা-বৌদিদের সিঁদুর খেলা শেষে হতে, ওদের ঠাকুর নামানোর পালা। তার আগে দারুন করে সিদ্ধির শরবত বানাল লাহিড়ীকাকু আর ঘোষালকাকু। সবাই একটু করে খেল। হাম্পু আর বাবলু কায়দা করে দু'গ্লাস মেরে দিল। ওদিকে ঠাকুর নামাতে গিয়ে, ঠাকুর হেলিয়ে প্যান্ডেল থেকে বের করতে গিয়ে, এক কাণ্ড। হাম্পু ঠাকুরের ভারে প্রায় চাপা পড়ে যায় আর কী! প্রানপনে চেষ্টা করে বাবলু, বাপ্পা আরো কয়েকজন মিলে ঠাকুর সোজা করল। হাম্পু অক্ষতভাবে তলা থেকে বেরিয়ে এল। সিদ্ধির নেশায় তখন সকলে বুঁদ। তবু বাবলু বুঝতে পারল, এত জোর দিয়ে ঠাকুর তুলতে গিয়ে ওর কোমরে ভালমতো চোট লেগেছে। হাম্পু এদিকে প্রেমশোকে পাগল। 'আমায় কেউ ভালবাসে না রে।', বলে বাবলুকে জড়িয়ে ধরছে মাঝে মাঝে।
বাবলুর আর কোমর ব্যথায় সেবার ভাসানে যাওয়া হল না, বাড়ি গিয়ে শুয়ে রইল। মা হাল্কা মালিশ করে দিলেন কোমরে। বাবাও খুব বকতে লাগলেন। সিদ্ধির নেশায় বাবলুর খালি মনে হতে লাগল, ওর কোমরটা যদি সারা জীবনের মতো অকেজো হয়ে যায়! ও যদি নিজের পায়ে আর দাঁড়াতে না পারে! কি হবে তাহলে? আগের পরের সব ঘটনা পরম্পরা ওর গুলিয়ে যেতে লাগল। রাকা কি ওকে ভালবাসে? এটা ও কিছুতেই স্থির করতে পারল না, ইলিউশনে পাক খেতে লাগল। ওদিকে ভাসানে শোভাযাত্রার সঙ্গে মেয়েরা কিছু দূর অব্দি গিয়ে, তারপর ফিরে আসে। ওদের পাড়ার এটাই নিয়ম। ভাসানের হৈ হৈ, নাচানাচি, গান-বাজনা, এসবের মধ্যে রাকা একটা হাতচিঠি লুকিয়ে নিয়ে অনেক ঘুরল। কিন্তু বাবলুকে কোথাও দেখতে পেল না। বাবলু কোথায় গেল?
ওদিকে বাবলু কোমর ব্যথায় অস্থির হয়ে কয়েকদিন বাড়িতেই শুয়ে রইল। এক্সরে, ওষুধপত্র, ফিজিওথেরাপি করে ধীরে ধীরে একটু সুস্থ হতে, আবার হাঁটা চলা শুরু করতে পারল। এই ক'দিন ওর আর জানলার ধারে যাওয়া হয়নি, সেদিনের কথামতো ক্লাবঘরে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। বিছানা থেকে উঠতেই পারেনি ক'দিন। হাম্পু এসে রোজ গল্প করে গেছে, ওর পাশে অনেকক্ষণ বসে থেকেছে। কিন্তু ওর থেকেও রাকার কোন খবর পায়নি। তিন চার দিন পরে বাবলু সুস্থ হয়ে যখন পাড়ার ক্লাবঘরে গেল, দুঃসংবাদটা হাম্পুই দিল। 'শুনেছিস? রাকারা নাকি দিল্লি চলে যাচ্ছে!' 'মানে? কী বলছিস তুই?', আর্তনাদ করে উঠল বাবলু। 'হ্যাঁ, বিপ্লবকাকুর ট্রান্সফার হয়ে গেছে দিল্লিতে। আজই একটু আগে শুনলাম।' 'সে কী! রাকারা চলে যাবে?', প্রায় কেঁদেই ফেলে বাবলু। তখনই পাগলের মত ছুটে যেতে চাইল রাকাদের বাড়ির দিকে। হাম্পু আটকাল। 'কোথায় যাচ্ছিস?' 'কেন? রাকাদের বাড়ি।', বাবলু চিৎকার করে বলল। 'চুপ কর। কী করবি ওদের বাড়ি গিয়ে? বোকার মত কাজ করিস না।', হাম্পু ধমকাল। বাবলু নিজেকে একটু সামলে নিল। হাম্পুর কথা ও ফেলতে পারে না। সত্যিই তো ও গিয়ে কী করবে? কীই বা বলবে? রকে বসে মাথাটা একটু ঠাণ্ডা হলে ও বলল, 'তোকে বিপ্লবকাকুর দিল্লিতে ট্রান্সফারের খবর কে দিল?' 'কে আবার দেবে? সবাই জানে। তোর বাবা আর বিপ্লবকাকুই তো সেদিন কত গল্প করছিল। তুই বাড়িতে শুনিসনি কিছু?' 'না তো!', অবাক হয়ে গেল বাবলু। ওর বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল, তার সঙ্গে ভীষণ চিন্তাতেও পড়ে গেল। রাকারা চলে যাবে? ওর প্রেম ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে? কী করে আটকাবে রাকাদের? ওর সঙ্গে একবার দেখা হওয়া দরকার। কিন্তু সেটাই বা কীভাবে সম্ভব? বাবলু বসে বসে ভাবতে লাগল, ভাবতেই লাগল। হাম্পুও কোন সমাধান জানাতে পারল না। চোখ ছলছল করে উঠল বাবলুর। হাম্পুরও সেটা নজর এড়াল না। ও বলল, 'মন খারাপ করিস না রে। দেখ, হয়তো ওরা কয়েক মাসের জন্য যাচ্ছে। অথবা এমনও হতে পারে, কাকু হয়তো একাই যাবে। রাকারা এখানেই থাকবে।' 'হ্যাঁ সেটা তো হতেই পারে। রাকাকে ক্লাস টেনে কি আর স্কুল ছাড়িয়ে দিল্লীতে নতুন স্কুলে ভর্তি করাবে?', বাবলু বলল। কিন্তু তাও পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারল না।
বাবলু জানলা খুলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে বসে থাকল, কিন্তু ক'দিন ধরে রাকার পড়ার ঘরের জানলা আর খুলল না। মা এসে গল্পচ্ছলে বললেন, 'তোর আর জানলা দিয়ে উঁকি ঝুঁকি মেরে লাভ নেই রে বাবলু। রাকারা বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে দিল্লী চলে যাচ্ছে।' মার কথাগুলো যেন তীরের মত বিঁধল বাবলুর বুকে। মা এভাবে বলতে পারলেন! মাও তাহলে চান, রাকারা চলে যাক? চিরকালের মতো? বাবলু তো কারো কোন ক্ষতি করেনি, তাহলে ওর মনটাকে ভেঙে দিয়ে কেন সবাই খুশি হবে? বাবলুর জীবনটা যে শেষ হয়ে যাবে, সেটা কেউ কেন ভাবছে না? বাবলু ফ্যালফ্যাল করে মার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, কোন কথা বলতে পারল না। তারপর পড়াশোনায় মন দিল।
এরপরে বাইরে এক দু'বার রাকার সঙ্গে দেখা হয়েছে বটে বাবলুর, কিন্তু রাকা কথা বলতে চায়নি, এড়িয়ে গেছে। ওর চোখেমুখেও ভীষণ বিষন্ন একটা ভাব ফুটে উঠেছিল, বাবলু দেখেছে। হাম্পু বলছিল, রাকাদের বাড়ি থেকেও নাকি ক'দিন আগে চিৎকার-চেঁচামেচি, কান্নাকাটির শব্দ শোনা গেছে। রাকা নাকি মারও খেয়েছে বাবা-মার কাছে। বাবলু অবশ্য সেরকম কিছু মনে করতে পারল না, সেই সময় হয়তো ও স্কুলে বা কোচিংয়ে গেছিল। বাবলু কিন্তু একটা জিনিস কিছুতেই বুঝতে পারছিল না। রাকা কেন ওর সঙ্গে কথা বলতে চাইছে না, আলাদা করে দেখা করতে চাইছে না। ও কী দোষ করেছে? কী করে রাকাকে ও বলবে, 'তুই যাস না প্লিজ। তুই এখানেই থাক, আমার কাছে থাক। তোকে না দেখতে পেলে আমি যে মরে যাব।'
ক'দিন পরের কথা। রাকাদের বাড়ির সামনে সকালবেলা একটা ট্রাক এসে দাঁড়াল। কুলীরা সব জিনিসপত্র উপর থেকে নামিয়ে এনে তাতে তুলতে শুরু করল। শব্দে শব্দে সবাই জানতে পারল, ওরা আজই চলে যাচ্ছে। বাবলু হতবুদ্ধি হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকল, কখনো বা জানলা দিয়ে ওদের ঘরের জানলার দিকে নিশ্চুপ অপেক্ষায় তাকিয়ে রইল। যে জানলার মধ্যে দিয়ে জমে উঠেছিল ওদের ভাল লাগা, ওদের প্রেম, ইশারা, শুধু চোখের দেখা, সেই জানলাটাও আজ যেন আশ্চর্য রকম নিরুত্তাপ। এইটুকুই তো বাবলুর সারা জীবন জুড়ে ছিল। আর এটুকুও চলে গেল? আসলে সবটুকুই চলে গেল। বাবলু অসহায়, ও জানে ওর কিছু করার নেই। ও রাকাদের যাওয়া আটকাতে পারবে না। কিন্তু প্রেম, সে কি আটকানো যায়? ভুলে কি থাকা যায়?
যাবার আগে রাকার বাবা-মা রাকাকে নিয়ে বাবলুদের বাড়িতে শেষবারের মতো দেখা করতে এলেন। বাবলু ওদের কী বলবে বুঝতে পারল না, শুধু প্রণাম করল। কাকু-কাকিমা ওর মাথায় হাত দিয়ে আদর করলেন। রাকাও বাবলুর বাবা- মাকে প্রণাম করল। ভীষণ নিয়ম-রক্ষার শেষ দেখা। রাকা একবারও বাবলুর দিকে চোখ তুলে তাকাল না। বাবলুর শেষ কথাটাও তাই রাকাকে আর বলা হল না। শুধু দু'চোখ ভরে শেষ দেখা দেখে গেল রাকাকে। আর কোনদিন ওর সঙ্গে দেখা হবে না? বাবলু জাস্ট ভাবতে পারছিল না। ওদের নতুন ঠিকানাটা কি জানা যাবে? চিঠি দেওয়া যাবে? ওদের দিল্লির বাড়িতে কি ফোন থাকবে? কীভাবে যোগাযোগ করবে রাকার সঙ্গে? বাবলুর মনে ঝড় উঠতে লাগল। কিন্তু রাকা কেন এভাবে মুখ গুঁজে পুতুলের মত চুপচাপ বসে আছে? কোথায় সেই প্রাণচঞ্চল দামাল ছটফটে ভাব? বাবলুর বাবা-মা রাকাকে বললেন, 'কী, পুরোনো জায়গা ছেড়ে চলে যাচ্ছিস বলে দুঃখ হচ্ছে বুঝি? ও ক'দিন একটু হবে। তারপর দেখবি ওখানেও সব নতুন নতুন বন্ধু হয়ে যাবে।' শুনে বাবলুর বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। নতুন বন্ধু! রাকা কি তবে ওকে ভুলে যাবে?
'তুই চলে যাচ্ছিস কেন? আমায় ছেড়ে যাস না, প্লিজ। আর আমাদের দেখা হবে না, না? অন্তত চিঠি দিস। দিবি তো?' শুধু এই কটা কথা বাবলু চিঠিতে লিখে রেখেছে, রাকাকে দেবে বলে। চিঠিটা রাকার হাতে সবার অলক্ষ্যে গুঁজে দিতে হবে। এদিকে কথাবার্তা শেষে ওরা সবাই উঠে পড়ল। শেষ বিদায় নিয়ে চলে যেতে গেটের কাছে পৌঁছে গেল সবাই। বাবলু রাকার দিকে সন্তর্পনে সরে এল। তারপর রাকার হাতে ছুঁইয়ে চিঠিটা ওর হাতে গুঁজে দিতে চাইল। কিন্তু রাকা হাতের মুঠো খুলল না, হাত সরিয়ে নিল। চিঠিটা আর দেওয়া হল না রাকাকে। বাবলুর বুকটা শেষবারের মত ভেঙে চৌচির হয়ে গেল। শেষ আশাটুকুও তছনছ হয়ে গেল। বাবলু বুঝল রাকা সত্যিই ওর সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখতে চায় না। ওকে ছেড়ে চলে যেতে চায়, ওকে ভুলে যেতে চায়। পুরো ব্যাপারটা হজম করতে বাবলুর ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। এ রাকা অন্য রাকা, ভীষণ অচেনা। ওর থেকে অনেক দূরে চলে যাওয়া রাকা। রাকা যে আর ওর নয়, বুঝতে পেরে স্তব্ধ হয়ে গেল বাবলু। ওর চোখ জলে ভরে গেল।
রাকাদের গাড়িটা ট্রাকের পিছু পিছু চলতে শুরু করল। জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ওরা সবাইকে টাটা করতে লাগল। পাড়ার সবাই, যারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে ওদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, তারাও হাত নেড়ে ওদের শেষ বিদায় জানাচ্ছিল। রাকা কিন্তু কারো দিকে হাত নাড়ছিল না। রাকা কেমন যেন হয়ে গেছে। ও কি বাবলুকে কিছু বলে যেতে পারত না? কিচ্ছু করতে পারত না? দিল্লি যাওয়া না আটকাতে পারুক, যোগাযোগটা তো রাখাই যেত। কিন্তু রাকা তো সে রাস্তাও বন্ধ করে দিয়েছে, ফিরিয়ে দিয়েছে বাবলুকে, ভেঙে দিয়েছে প্রেম। প্রথম প্রেম। ঘা খেয়ে বাবলুর জীবনের প্রতিটা মুহূর্তই তখন অসহ্য, মূল্যহীন বলে মনে হচ্ছে।
গলিটা পেরিয়ে গেল ওদের গাড়ি। এ সেই গলি, যেখানে প্রথম হাতে হাত, চোখে চোখ রাখা। গলি পেরিয়েই বড় রাস্তা। সেখানে পৌঁছে গেলেই ওদের গাড়িটা হাজার গাড়ির সমুদ্রে হারিয়ে যাবে। আর রাকাও হাজার মানুষের সমুদ্রে হারিয়ে যাবে। কিন্তু রাকা তো আর পাঁচজনের একজন নয়! ওর প্রিয়তমা। কিন্তু যারা ইচ্ছে করে হারায়, তাদের কি আর কোনদিন খুঁজে পাওয়া যায়? বাবলু ছুটে বেরিয়ে আসতে চাইল বাড়ির বাইরে, কিন্তু পারল না। ওদের গাড়িটাকে আর দেখা যাচ্ছে না, সব শেষ। বাবলু শুধু মাথা তুলে দেখতে পেল ওদের ছেড়ে যাওয়া বাড়িটাকে। জীর্ণ, ময়লা, প্রাণহীন বাড়িটার বন্ধ সেই জানলাটার দিকে অভ্যাসবশে চোখ চলে গেল ওর। এ সেই জানালা, যার মধ্যে দিয়ে জমে উঠেছিল ওদের প্রেম, ওর জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময়টুকু। বাবলুর জীবনে সেই জানলা আজ চিরকালের মতো বন্ধ হয়ে গেল। ওদিকে আর তাকাতে পারল না বাবলু, তাকিয়ে থেকেই বা কী হবে? আর কোনদিন তাকাতে পারবেও না ওদিকে। পুরো বাড়িটা যেন বিদ্রুপ করছে বাবলুকে, জানলাটাও। কী এক অসহনীয় সব হারানোর দুঃখ বুকে নিয়ে, বোকার মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে বাড়িটা। বাবলু আর সহ্য করতে পারল না। ছুটে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল। হাতের মুঠোয় তখনো ধরা রয়েছে দলা পাকানো সেই চিঠিটা।
ডাস্টবিনে চিঠিটাকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে দিয়ে, বাবলু দ্রুত নিজের ঘরে চলে এল। আরো দুটো জিনিস ফেলে দিতে হবে। জয় গোস্বামীর কবিতার বইটার সেই লুকোনো পাতা থেকে ও দ্রুত বের করে আনল রাকার দেওয়া সেই অঞ্জলির ফুল আর চিরকুটটা। কিন্তু ফেলে দিতে পারল না। বরং এক ফোঁটা চোখের জল পড়ল সেই পাতাটার ওপর। বাবলু পাতাটা বন্ধ করে দিল। প্রিয়তমা চলে গেছে জীবন থেকে, কিন্তু ওর স্মৃতি ও কোনদিন ফেলে দিতে পারবে না। বাবলু বইটা যত্ন করে আবার তাকে তুলে রাখল। সেই শুকনো ফুলে আজ আর গন্ধ নেই, রং নেই। কারো কাছে সেই ফুল আর কাগজের টুকরোটার হয়তো কোন মূল্যও নেই। কিন্তু এক ফোঁটা চোখের জলের ছোঁয়া পেয়ে সেগুলো আজ অমূল্য হয়ে গেল।
সমর্পণ
কোম্পানির সেলস হেড অফিসে হঠাৎ ট্রান্সফার হয়ে, সন্দীপনের পোস্টিং হয়ে গেল টাটায়। হাওড়ায় স্টকইয়ার্ডের আরামের চাকরি, বাড়ি থেকে যাতায়াতের সুবিধা, বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, মা-বাবা-আত্মীয়-স্বজন পরিবৃত নিরুপদ্রব জীবনটাকে উপড়ে নিয়ে, কমলিকা আর একমাত্র মেয়ে সোহিনীকে নিয়ে চলে যেতে হল জুবিলি পার্কের উল্টো দিকে কোম্পানির দু' কামরার কোয়ার্টারে।
প্রথম প্রথম কলকাতা শহর, বন্ধুবান্ধব আর বাবা-মার জন্য ওর বেশ মন কেমন করত। কিন্তু ধীরে ধীরে সব অভ্যাস হয়ে গেল, নতুন বন্ধু-বান্ধবও হল বেশ কিছু। টাটা সামাজিক জীবন যাপনের পক্ষে বেশ সমৃদ্ধ জায়গা, আধুনিক সমস্ত সুযোগ সুবিধাই সেখানে মজুত। তবে এই নতুন ডিপার্টমেন্টে কাজের চাপ অনেকটাই বেশি। প্রায় প্রতিদিনই বাড়ি ফিরতে রাত সাড়ে সাতটা-আটটা বেজে যায়। তবে তারই মধ্যে, সন্দীপন প্রতি উইকএন্ডে, কমলিকা আর সোহিনীকে নিয়ে কোনও না কোনও জায়গায় বেড়াতে যায়, বাইরে খাওয়া দাওয়াও সারে। মনটা যাতে যান্ত্রিক না হয়ে পড়ে, একটু ফ্রেশ হয়ে ওঠে, তার জন্য সব চেষ্টাই ও করে।
কিন্তু কমলিকার থেকে কিছু যেন একটা ঠিকমত পাচ্ছিল না সন্দীপন। সত্যিই কি পাচ্ছিল না? নাকি কমলিকাকে ততদিনে একঘেয়ে লাগতে শুরু করেছিল? হতেও পারে। তাই কাজের টেনশন থেকে মুক্তি পেতে, ও গোপনে ফেসবুকে বান্ধবী খুঁজতে শুরু করল। খুঁজতে খুঁজতে বেশ কিছু বান্ধবী জুটেও গেল। ওর উদ্দাম প্রেম আর যৌনতার খিদেকে সামাল দেবার সাধ্য হয়ত তখন কমলিকার ছিল না। ও এক নিতান্ত ঘরোয়া, সাধারণ আর একঘেয়ে বিয়ে করা বৌ মাত্র। আর সন্দীপন তখন নেশায় পাগল হয়ে খুঁজছে মনের মত নতুন এক বান্ধবী। ঠিক সেই সময়ে, ও যেমনটি চাইছিল, তেমনটাই পেয়ে গেল ওর ফেসবুক ফ্রেন্ড স্বর্ণালীর মধ্যে। ওরা হয়ে উঠল একে অপরের ফোনফ্রেন্ড থেকে বেস্টফ্রেন্ড।
'তুমি আজকাল বড্ড ফোন নিয়ে ব্যাস্ত থাক, আমার সঙ্গে কথা বলার সময়ই পাও না।', একদিন মৃদু অনুযোগ করে কমলিকা।
'কী করব বল? অফিসের এত ফোন আসে! সব কাজের ব্যাপার।', সন্দীপন আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করে।
'অফিসের ফোন তো আড়ালে গিয়ে কথা বলার কী আছে? আমার সামনেও তো বলতে পার। কী এমন গোপন কথা?', সন্দেহ মনে লুকিয়ে বলেই ফেলে কমলিকা।
সন্দীপন ঢোঁক গেলে। কমলিকা কি কিছু সন্দেহ করেছে? মুখে স্মার্টনেস এনে শুধু বলে, 'আরে, আড়ালের কী আছে? অফিসের কূটকচালি তোমার শুনতে ভাল লাগবে না, তাই।'
কমলিকা আর বেশি কথা বাড়ায় না। ও ভীষণ সরল মনের মেয়ে, সন্দীপনকে প্রাণ মন দিয়ে ভালবাসে, বিশ্বাস করে। সন্দীপনের এইসব নতুন ফেসবুক ফ্রেন্ড বা ফোনফ্রেন্ডদের সঙ্গে যৌনতামাখা রগরগে আলাপের কথা জানতে পারলে, হয়তো ও লজ্জায় ঘৃণায় আত্মহত্যা পর্যন্ত করে ফেলতে পারে। সন্দীপন সেটা ভাল করেই জানে। তাই কমলিকা যাতে ঘূণাক্ষরেও টের না পায়, সেই ব্যাপারে ও সবসময় সতর্ক থাকে। সংসারে এসব পরকীয়ার প্রভাব পড়লেই বিপদ, দারুন অশান্তি হবে। এত কাজের চাপ, মানসিক চাপের মধ্যে, ও আর নতুন করে কোন ঝামেলা-অশান্তি চায় না। শুধু একটু নির্মল আনন্দ চায়। স্বর্ণালী ছাড়া আর কেই বা সেটা দিতে পারে? তাই অফিস টাইমে, প্রতিদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে, ফোনালাপে ওদের প্রেম জমে উঠতে থাকে।
স্বর্ণালীকে সন্দীপন বলে দেয়, 'আমি বাড়ি ফেরার পর, তুমি আর একদম ফোন করবে না। তখন আমি কিন্তু আর তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারব না। বৌ সন্দেহ করবে।'
'ঠিক আছে, বাবা। তোমার ফ্যামিলিতে কোন অশান্তি হোক, আমিও চাই না। শুধু আমাকে একটু সময় দিও রোজ। আমাকে ভুলে যেও না, প্লিজ।', কাতরভাবে বলে স্বর্ণালী। অনুপমের সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে যাবার পরে, ছোট্ট মেয়ে তুলিকে নিয়ে ও এখন বড় একা, অসহায়। ওর এখন ভীষণ দরকার একটা সত্যিকারের বন্ধু, একটা মানসিক সাপোর্ট, আর মাথা রাখার মত একটা চওড়া কাঁধ। যৌবনের কামোন্মত্ততায় ও'ও তখন ফুটছে, কোন একজন বিশ্বস্ত বন্ধু চাই সেই অভাব পূরণ করার জন্য।
সন্দীপন আর স্বর্ণালী দুজনেই বেশ কবার ভিডিও কলও করেছে, একে অপরকে জেনেছে, গাঢ় হয়েছে সম্পর্ক। শুধু কি ফোনফ্রেন্ড হলে আশ মেটে? তাই পরের বার সন্দীপন যখন কলকাতায় গেল, তখন দুজনে দেখাও করেছে একটা রেস্টুরেন্টে। সেখানে একে অপরকে চাক্ষুষ দেখে ওরা মুগ্ধ হয়েছে, ঘনিষ্ঠতা এক লাফে বেড়ে গেছে অনেকটাই।
আগল খুলে গেল। তারপর থেকে যখনই সন্দীপন ছুটি পেয়েছে, কমলিকাকে কিছুই জানায়নি। উল্টে স্টকইয়ার্ড ইনস্পেকশনের অফিসিয়াল কাজের ছুতো করে, ও একাই চলে এসেছে কলকাতায়। কমলিকা অতশত বোঝেনি, কোন সন্দেহও করেনি। 'আমাদেরও নিয়ে চলো না! কতদিন বাড়ি যাইনি।', কমলিকা শুধু রিষড়ায় ওর বাপের বাড়ি যাবার জন্য আবদার করেছে। কিন্তু সন্দীপন প্রতিবারই নানা ছুতোয় সেটা কাটিয়ে দিয়েছে, 'এই তো দু'দিনের জন্য যাব আর আসব। এবারে আর গিয়ে কী করবে? বরং পরের বার নিয়ে যাব।'
পরের বারও কলকাতা গিয়ে, কমলিকা-সোহিনীকে রিষড়ায় ছেড়ে দিয়ে, সন্দীপন তড়িঘড়ি অফিসের কাজের নাম করে বেরিয়ে পড়েছে। তারপর সোদপুরে গিয়ে স্বর্ণালীর সঙ্গে দেখা করে, যথারীতি দুজনে ক্যাবে করে সোজা চলে গেছে ডায়মন্ড হারবার রোডে জোকার কাছে 'গ্র্যান্ড গার্ডেন' রিসর্টে। ওখানে গার্লফ্রেন্ড নিয়ে সারা দিন আনন্দ করার জন্য কটেজ ভাড়া পাওয়া যায়। লাঞ্চ, স্ন্যাক্স, ডিনার সব পাওয়া যায়। মোটামুটি সস্তাই, তবে আসল ব্যাপার হল ওখানকার দারুন সেফটি আর প্রাইভেসি, কোন পুলিশের ঝুটঝামেলা নেই। ওখানেই দুজনে উদ্দাম আদর আর যৌনসুখে মেতে ওঠে গোটা দিনভর। তারপর স্বর্ণালীকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে, সন্দীপন চলে আসে নিজের বাড়ি। পরের দিন সন্ধ্যায় কমলিকাদের রিষড়া থেকে উঠিয়ে নিয়ে, ট্রেন ধরে আবার ফিরে আসে টাটা।
এভাবেই বেশ চলছিল। সন্দীপনের এই গোপন সম্পর্কের ব্যাপারে কমলিকা কিছুই জানতে পারেনি, বিন্দুমাত্র সন্দেহও করেনি । আসলে বাড়ি থাকলে, সন্দীপন কখনোই স্বর্ণালীর সঙ্গে ফোনালাপ করত না। তখন ফোনের ভাইব্রেট মোডে, শুধু চ্যাটিং আর মেসেজিং।
'তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না।', প্রায়ই বলত স্বর্ণালী।
'আমিও তোমাকে ছাড়া।', ভাবলেশহীনভাবে যেন মুখস্থ বুলি বলত সন্দীপন।
'কিন্তু আমি যে তোমাকে পুরোপুরি চাই, আমার নিজের করে চাই। এসো না আমার কাছে!', আব্দার করত স্বর্ণালী।
'পাগলের মত কথা বোলো না। জান না, আমার ফ্যামিলি আছে?', থামাতে চাইত সন্দীপন।
'তো আমি কী করব? আমি যে তোমাকে পাগলের মত ভালবাসি। তোমাকে সবসময় আমার শরীরে অনুভব করি। কী করব আমি, বলে দাও।', উত্তেজিত হয়ে বলত স্বর্ণালী।
কমলেশ জানে দু'নৌকায় পা দেবার জ্বালা। পরকীয়া করতে হবে গোপনে। তাতে শুধু থাকবে যৌনসুখ, উদ্দাম বাঁধনহীন আনন্দ, কিন্তু কোন দায়িত্ব বা পিছুটান নয়। এ তো শুধু ক্ষনিকের ভালবাসা, তাতে জড়িয়ে পড়ে ফেঁসে গেলে চলবে না। তাই সাবধানে সামলাতে চেষ্টা করত স্বর্ণালীকে। বলত, 'আমিও কি তোমাকে ভালবাসি না, বলো? কিন্তু এদিকটাও তো সামলে চলতে হবে, তাই না?'
'আমি কি তোমাকে কখনো জোর করেছি? কর না তুমি বউ-মেয়ে নিয়ে সংসার! শুধু আমি ডাকলেই আসবে তো?', স্বর্ণালী কাতরভাবে বলত।
'চেষ্টা তো করি।', নিরুত্তাপ সন্দীপন।
'আমি আর পারছি না, সন্দীপন। তোমাকে ছাড়া যে আমার দিন কাটে না। তুমি না থাকলে আমার সবকিছু ফাঁকা, বিশ্রী লাগে।', কাঁদতে কাঁদতে বলত স্বর্ণালী। কখনো বা রাগে চিৎকার করত, আবার কখনো আত্মহত্যা করার হুমকি দিত। এভাবেই চলছিল এক অবৈধ প্রেম। ক্রমশই বেড়ে উঠছিল ওদের মোহ, একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া। সেই সম্পর্কের কোন ভবিষ্যৎ নেই, কোন নাম নেই, তা কোনদিন কোন পূর্ণতাও পাবে না। শুধুমাত্র যৌন তাড়না। ওরা সেই সম্পর্কটাকেই জোড়াতালি দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিল, ক্রমশ ডুবে যাচ্ছিল এক নেশার চোরাবালিতে। তার থেকে বেরিয়ে আসার ওদের কারোরই কোন উপায় জানা ছিল না, ইচ্ছেও নয়। শুধু খুব হিসেব করে চলতে হত সন্দীপনকে, সংসারটা তো বাঁচাতে হবে। সে সমস্যা অবশ্য ছিল না ডিভোর্সি স্বর্ণালীর। তাই ও হয়ে পড়েছিল একটু বেশিই আবেগপ্রবণ, একরোখা আর জেদী। নিজের সবটুকু দিয়ে, প্রাণ দিয়ে, ও ভালবেসে ফেলেছিল সন্দীপনকে।
আগে মন, পরে তো শরীর। মানসিক বন্ধন না থাকলে কি আর শারীরিক সম্পর্ক আসে? সন্দীপনকে সমস্ত শরীর-মন সমর্পণ করেছিল স্বর্ণালী। ওদিকে সন্দীপন যতই জড়িয়ে পড়ছিল, ততই ভয় পাচ্ছিল সম্পর্কটাকে, যদি বেরিয়ে আসতে না পারে? যদি লোক জানাজানি হয়ে যায়? যদি ও ফেঁসে যায়? সংসারটা তো ভেসে যাবে তাহলে! না, কমলিকা-সোহিনীকে সন্দীপন জীবন দিয়ে ভালবাসে, তাদের ছেড়ে ও কিছুতেই থাকতে পারবে না। সংসারে এই সর্বনাশা সম্পর্কের কোন আঁচ ও আসতে দেবে না। স্বর্ণালীও সেটা মেনে নিতে বাধ্য হয়। ভীষণ কঠিন, তবু বাঁধতে হয় নিজের মনটাকে, রাশ টানতে হয় দুর্নিবার ইচ্ছে আর স্বপ্নগুলোতে, যে স্বপ্ন সব মেয়েই দেখে জীবনে। একবার সে স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে অনুপম, তবু আবারও স্বপ্ন দেখতে ওর ভীষণ ইচ্ছে করে। রক্ত মাংসের একটা নারীর শরীর-মন তো!
কী করে স্বর্ণালীকে বেঁধে রাখবে, বুঝতে পারে না সন্দীপন। শেষে একদিন বলে, 'আচ্ছা, তুমি এবার একটা বিয়ে করে নাও না! পাত্র দেখব?'
'কী বললে? বিয়ে! আবার! তুমি জান না, অনুপমের অত্যাচারের কথা? কীভাবে, কত কষ্ট করে আমাকে ডিভোর্স আদায় করতে হয়েছে? আজ আমি একটু শান্তিতে আছি, আর তুমি বলছ বিয়ে করে নিতে?', রেগে বলে ওঠে স্বর্ণালী।
'কিন্তু কতদিন এইভাবে চলবে, বলো? তোমারও তো একটা ভবিষ্যৎ আছে! মেয়েটা বড় হচ্ছে। ওর কথাও তো ভাবতে হবে।'
'থাক, তোমাকে আর অত মাথা ঘামাতে হবে না। আমার বাবা-মা আছে, আমাদের ঠিক চলে যাবে। এসব ভাবনা আমার। শুধু তুমি আমাকে টাইম দেবে বলো। যখনই আমি চাইব, আমার কাছে আসবে, বলো।', স্বর্ণালী আবেগতাড়িত হয়ে বলে।
আর এই আবেগকেই বড় ভয় সন্দীপনের, বশে না থাকলেই বিপদ। আবেগ সংযম করে, অঙ্ক কষে চলতে জানে সন্দীপন। সেখানে ঝুটো প্রেম আর শারীরিক খিদের ধান্দাবাজি। এর বাইরে আর কিছু জানে না ও। 'আরে আমি তো আছিই। কিন্তু আমারও তো ফ্যামিলি আছে, তাই না?', ও বলে।
'থাক, আর মনে করিয়ে দিতে হবে না, যে তোমার ফ্যামিলি আছে। আচ্ছা, তুমি কি আমাকে একটু বেহিসেবি ভাবেও ভালবাসতে পার না? সব সময় এরকম সিঁটিয়ে থাক কেন?'
'কী করব বল। যদি কেউ আমাদের একসঙ্গে দেখে ফেলে? তাহলে তো সব জানাজানি হয়ে যাবে। বৌ একবার জেনে গেলে আর আমাদের দেখা করা যাবে না, সব বন্ধ হয়ে যাবে। বুঝতে পারছ না?'
'সব বুঝেছি। তুমি দিনকে দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছ! আমার সঙ্গে ভাল করে কথা বল না, আদর কর না, আজকাল আমার মুখের দিকে পর্যন্ত তেমন তাকাও না।'
'ধুর, কী যে বল!'
'আমি সব বুঝি। কেন আমাকে এরকম কষ্ট দিচ্ছ, বল? আমি কী অন্যায় করেছি?'
সন্দীপন বেশ বুঝতে পারে, সম্পর্কটা থেকে ও বেরিয়ে আসতে পারছে না, এমনই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে। তবে কি ও'ও স্বর্ণালীকে ভালবেসে ফেলল? কিন্তু ও যে কমলিকাকে ভালবাসে, সোহিনীকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসে। ও যে বিবাহিত, কারো স্বামী, কারো বাবা। তাদেরকে তো আর অস্বীকার করতে পারবে না! ছেড়ে দিতেও পারবে না। ও তো মানুষ, জংলী পিশাচ নয়। কিন্তু পরক্ষণেই ওর মনে হয়, ভালবাসা কি আর একজনকে দিয়েই শেষ হয়ে যায়? তার নানা রূপ আছে। নানাজনকে নানাভাবে তা দেওয়া যায়। মানুষ তার মধ্যে কোনটার নাম দিয়েছে বৈধ, কোনটা বা অবৈধ। কিন্তু মন কি আর অতশত বোঝে, না মানে? স্বর্ণালীকে ছাড়া ও থাকতেই পারবে না। স্বর্ণালী ওর জীবনের অভ্যেসে পরিণত হয়েছে। ওর নিত্যকার প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে। ওর টেনশনে ভরা জীবনে, স্বর্ণালীই এক ঝলক টাটকা বাতাস। সুখস্বপ্নে জড়িয়ে রেখেছে ওকে, জীবনে ভাল করে বাঁচতে শিখেয়েছে। কী করে ওকে ছেড়ে দেবে সন্দীপন? দোনামনার দোলাচলে ও দুলতেই থাকে।
কিন্তু একদিন হঠাৎই সম্পর্কটা অন্য দিকে মোড় নেয়। স্বর্ণালী সেদিন ক্যাবে উঠেই বলে ওঠে, 'জানো, বাবা না আবার আমার বিয়ে দেবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। কী যে করি!'
'আরে এ তো ভাল কথা! রাজি হয়ে যাও। কী এমন বয়স তোমার?', সন্দীপন তৎক্ষণাৎ খুশি হয়ে বলে।
'কী বললে? তুমি পারলে এ কথা বলতে? জান না, বিয়ে হয়ে গেলে আমি আর তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারব না? তোমাকে ছাড়া আমি কী করে বাঁচব?', মুখ তুলে সন্দীপনের চোখে চোখ রেখে বলে স্বর্ণালী।
'খুব পারবে। চিন্তা নেই, মাঝে মাঝে তোমার বরকে লুকিয়ে চলে আসবে আমার কাছে। কোথাও না কোথাও আমরা ঠিক দেখা করে নেব। আমি যদি বউকে লুকিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারি, তুমি কেন পারবে না?'
'বাজে বোকো না তো! একটা মেয়ের পক্ষে সেটা অত সোজা নয়। বিয়ে হয়ে গেলে আর তোমার সঙ্গে দেখা হবে না। আমার অত সাহস নেই, বুঝলে?'
'কেন? আমার জন্য এটুকু করতে পারবে না?'
'না, তখন আমি বাঁধা পড়ে যাব। তুমি জান না, তুমি বুঝবে না।', স্বর্ণালীর চোখের কোণে এক ফোঁটা জল জমে।
তবুও দুজনের সম্পর্কটা টিঁকে রইল আরো কিছুদিন। কিন্তু একদিন হঠাৎ স্বর্ণালী ফোন করে দুঃসংবাদটা দিল। 'জান, অম্লানকে মনে হয় হ্যাঁ-ই বলে দিতে হবে।'
'অম্লান! সে আবার কে?'
'আরে ভুলে গেলে? সেদিন যে বললাম, বাবা একটা ছেলে দেখেছে।'
'ও হ্যাঁ হ্যাঁ, তা ও'ও কি ডিভোর্সি?'
'না না, ডিভোর্সি হতে যাবে কেন? তবে ওর আমাকে খুবই পছন্দ, কতবার যে বাড়িতে এল। আর ফোন? পারলে যেন ঘন্টায় ঘন্টায় করে।'
সন্দীপনের কথাগুলো শুনতে ভাল লাগে না। ওর রাইভাল এসে গেল নাকি? স্বর্ণালী অন্য কারো হয়ে যাবে? ওর অসহ্য লাগে কথাগুলো। কিন্তু মেনে নিতেই হবে, স্বর্ণালী ওর কে? কী অধিকার ফলাবে? তবু বলে, 'ও তোমার মেয়েকে মেনে নেবে?'
'হ্যাঁ, সেরকমই তো দেখলাম, মেয়ের সঙ্গে বেশ ভাব করে নিয়েছে এই ক'দিনে।', নতুন সংসারের স্বপ্নে তখন স্বর্ণালী বিভোর। সব মেয়েরই এমন হয়। যতদিন জীবনে কেউ আসেনি, স্বর্ণালী আঁকড়ে ধরেছিল সন্দীপনকে। এখন কিন্তু এখন ওর চোখে অন্য ভাবনা, অন্য পুরুষ এসেছে ওর জীবনকে নিশ্চিন্ত করতে। ওর কথাতেই খুশির সেই আভাস স্পষ্ট, বেশ বুঝতে পারে সন্দীপন।
'তাহলে আবার কী? বিয়ে করে নাও। ও নিশ্চয়ই তোমাকে ভালবাসবে।'
'দেখি। কাল ওর বাবা মা আসছেন।'
স্বর্ণালী এই প্রথম বিয়ের কথায় 'না' বলে চিৎকার করে ওঠে না। তার মানে ওকে এবার হারাতেই হবে! এতদিন যার থেকে মুক্তি পাওয়ারই কথা শুধু চিন্তা করে এসেছিল সন্দীপন, যাকে নিজের স্বার্থে শুধু যৌনতার পুতুল হিসেবে ভেবে এসেছিল, সেই স্বর্ণালীকে হারানোর কথায় কেন ওর মনটা এত খারাপ হয়ে যাচ্ছিল? স্বর্ণালী ওর থেকে চিরকালের মত অনেক দূরে চলে যাবে, এ কথা ভাবতেই কেন মনে এত কষ্ট উঠে আসছিল?
উৎকণ্ঠায় পরের দিনটা কাটে সন্দীপনের, আর ওকে ফোন করে না সারাদিন। বিচ্ছেদের ভাবনায় ওর মনটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। তা যাক, স্বর্ণালীরও তো নিজের একটা জীবন আছে, ভবিষ্যৎ আছে, সুখস্বপ্ন আছে। নতুন সংসার হোক ওর, ভাল হোক। ভাবতে থাকে সন্দীপন। সেইসঙ্গে ও নিজেও মুক্তি পাবে এই রোজকার টানাপোড়েনের জীবন থেকে, এই ভয়ঙ্কর পরকীয়া প্রেমের গোপনীয়তা বজায় রাখার নিত্যকার চাপের থেকে। ও এবার পুরোপুরি কমলিকার হাতেই নিজেকে সমর্পণ করে দেবে। যা ভুল হবার তা হয়েছে, এবার তার শেষ হোক। এ সবই ভাবতে থাকে ও।
পরেরদিন রাতে স্বর্ণালীই মেসেজ করে। সারাদিন ধরে ও কোন ফোন বা মেসেজ করেনি।
'সামনের বৈশাখে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল।'
'কনগ্রাচুলেশন্স, আমাকে নেমন্তন্ন করবে না?'
'তুমি এমন বোকার মত কথা বলো না!'
'কেন? আর আমাদের দেখা হবে না, না?'
ওদিক থেকে মেসেজের আর কোন উত্তর আসে না। সন্দীপন ভাল করেই বুঝতে পারে স্বর্ণালী ওকে ভুলে যেতে চাইছে, অতীত ভুলে সামনের দিকে তাকাতে চাইছে। আর সেটাই স্বাভাবিক।
'তাহলে এখানেই সব শেষ, তাই তো?'
আবারও মেসেজের কোন উত্তর আসে না। তখন সন্দীপন কাঁপা কাঁপা হাতে শেষ আর একটা মেসেজ টাইপ করে।
'আমি চললাম, বিদায়। আর আমাকে কোনদিনই খুঁজে পাবে না।'
মেসেজটা পাঠিয়ে দিয়ে চোখের জল লুকোতে চেষ্টা করে সন্দীপন। এখন ও বাড়িতে। কমলিকা রান্নাঘরে ব্যস্ত। এরপর মোবাইলটা অফ করে দেবে ও। তারপর চিরকালের মতো সব শেষ হয়ে যাবে, হারিয়ে যাবে একটা গোটা সম্পর্ক। মোবাইলটা অফ করার মুহূর্তেই, ভাইব্রেট করে শেষ একটা মেসেজ ঢোকে স্বর্ণালীর।
'তুমি সব সময় এরকম বল কেন?'
কিন্তু ততক্ষণে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে সন্দীপন। স্বর্ণালীকে ও ভালবাসে। আর সেই ভালবাসা চিরকালের মত, এখানেই স্থির হয়ে যাক। তা যেন ঘৃণা বা মনোমালিন্যে পরিণত না হতে পারে। ওকে সন্দীপন বাঁধনমুক্ত করে দিয়ে যাবে। আর কিচ্ছু করার নেই, ফিরে আসতেই হবে, এই সম্পর্কের শেষ টানতেই হবে। মনটা শক্ত করে, মোবাইলটা এয়ারপ্লেন মোডে করে দিয়ে, স্বর্ণালীর মেসেজগুলো একটা একটা করে মুছে দিল সন্দীপন। খুব কষ্ট হচ্ছে, বুকটা ধক ধক করছে উত্তেজনায়। কী করতে যাচ্ছে ও? কিন্তু ওকে পারতেই হবে। নিজের সম্মান থাকতে থাকতেই সরে আসতে হবে। সব মেসেজ, সব হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট ও মুছে ফেলে। তারপর ফেসবুকে স্বর্ণালীকে ব্লক করে দেয়। ফোনবুক থেকে ওর নামটাও মুছে দেয়। পুরোনো সব দিনের কথা, নানা ঘটনার কথা, একে একে মনে পড়ে যাচ্ছে, আর বুকটা ওর যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। সব যেন আজ খালি হয়ে গেল। স্বর্ণালী ওর নিজেরই অজান্তে, মনে এতটা জুড়ে ছিল?
আর একটা কঠিন শেষ কাজ করতে হবে, করতেই হবে। আর তাহলেই চিরকালের মতো মুক্তি। আর ওর সঙ্গে কোন যোগাযোগ করতে পারবে না স্বর্ণালী। চাইলেও না, মন দুর্বল হয়ে পড়লেও না। সন্দীপন ফোনটা অফ করে দেয়। তারপর সিমটাকে বের করে নেয়। তারপর দু'আঙুলের চাপে সিমটাকে ভেঙে দু'টুকরো করে ফেলে। তারপর সেটাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় জানলা দিয়ে বাইরে। আর কোনদিন সত্যিই স্বর্ণালী ওকে খুঁজে পাবে না। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, কিন্তু আর বেশি কিছু ভাবতে পারে না সন্দীপন। দ্রুত সামলে নেয় নিজেকে। কমলিকা কিছুই বুঝতে পারে না। ' কী গো, অনেক রাত হল তো! এবার খেতে দেব?', ও জিজ্ঞেস করে সরল মনে। 'হ্যাঁ, দাও, খিদে পেয়েছে।', নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে ওঠে সন্দীপন। কমলিকা হেসে চলে যায়। সন্দীপন একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। আজ ও ভারমুক্ত, অবশেষে ফেরত এসেছে কমলিকার কাছে, সোহিনীর কাছে। নিজের পরিবারের কাছে নিজেকে সমর্পন করে যে কী সুখ আছে, সেটা ও বুঝতে পারে।
ওর বাড়ি থেকে অনেক দূরে, অন্য কেউ, ঠিক তখনই বিছানায় মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে কি?
রক্সবার্গ হাউজের প্রেতাত্মা
বোটানিক্যাল গার্ডেনের যে অংশটা গঙ্গার একদম ধারে, সেখানেই রয়েছে একটা বহু পুরনো বাড়ি, নাম রক্সবার্গ হাউস। এককালে এখানেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি গাছের চারা আর বীজের স্টোররুম ছিল, আর ছিল উদ্ভিদবিদ্যার উপর বইয়ের এক বিশাল লাইব্রেরী। বাড়িটা প্রায় আড়াইশো বছরের পুরোনো। সতেরোশো সাতাশি সালে মেটিয়াবুরুজের ঠিক উল্টোদিকে গঙ্গার একদম ধারে, এই জায়গাতেই বোটানিক্যাল গার্ডেন তৈরি করা হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্নেল রবার্ট কিডের উদ্যোগে। তারপর সতেরোশো তিরানব্বই থেকে আঠেরোশো চোদ্দো সাল পর্যন্ত এই গার্ডেনের সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিযুক্ত হন উইলিয়াম রক্সবার্গ। তিনিই সতেরোশো চুরানব্বই সালে অসাধারণ স্থাপত্যের এই বাড়িটা নিজের বসবাসের জন্য তৈরি করেছিলেন, পরে অবশ্য এটাকে তিনি বীজ ও চারা সংরক্ষণ এবং লাইব্রেরি হিসেবেও ব্যবহার করতে শুরু করেন। রক্সবার্গ সাহেব সে সময় ভারতীয় উদ্ভিদবিদ্যার একেবারে পথিকৃৎ ছিলেন বলা চলে। তিনি 'ফ্লোরা ইন্ডিকা' বলে একটা বইও লিখেছিলেন, যাকে উদ্ভিদবিদ্যার বাইবেল বললেও কম বলা হয়। কিডসাহেব ওনাকে এই বোটানিক্যাল গার্ডেনের যত্ন নেবার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন। কারণ সাহেব-মেমদের অবসর যাপন আর বৈকালিক ভ্রমণের জায়গা ছিল এই বাগানটা। রক্সবার্গ সাহেব অতি যত্নে, ভারতীয় গাছপালার সমস্ত রকম প্রজাতির সেখানে পালন করার গুরুদায়িত্ব নিয়েছিলেন। প্রায় সাইত্রিশ বছর সেখান থেকে, বোটানিক্যাল গার্ডেনকে তিনি প্রাচুর্যে সাজিয়ে দিয়ে যান। শুরুর সময়কার মাত্র তিনশো প্রজাতির গাছ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রজাতিতে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন। অনেক জাতের চারা তিনি এদেশ থেকে লন্ডনেও পাঠিয়েছিলেন।
তবে দুঃখের বিষয়, ব্রিটিশ আমলের শেষে ধীরে ধীরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে, সেই রক্সবার্গ হাউস কালের গর্ভে হারিয়ে গেল। উনিশশো সত্তর সালে বাড়িটা একেবারে ভেঙে পড়ে, দেখলে মনে হত একটা পোড়োবাড়ি। তখনই বোটানিক্যাল গার্ডেনের অথরিটি ওটাকে পরিতক্ত বলে ঘোষণা করেন। তারপরে যদিও বাড়িটাকে হেরিটেজ বিল্ডিং হিসেবে ঘোষণা করা হয়, কিন্তু সরকার সেই সময় সেটাকে রক্ষা করার কোনো উদ্যোগই নিল না। বড় বড় থামগুলো প্রায় ভেঙে পড়ল, চারিদিকে বটের শিকড় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বাড়িটাকে ঢেকে ফেলল, প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হল গোটা বাড়িটা।
কিন্তু বছর পাঁচেক আগে, হঠাৎই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। বোটানিক্যাল গার্ডেনের কিছু মালি একদিন কাজের শেষে গঙ্গার ধারে গিয়ে হাত-পা ধুচ্ছিল, রক্সবার্গ হাউজের ঠিক পিছনেই একটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘাট ছিল। ওদের সঙ্গে ছিল ওদেরই কন্ট্রাকটার অরিন্দম সাহা। যদিও গঙ্গার জল কবে থেকেই দূষণে একদম ঘোলাটে হয়ে গেছে , তবুও ওই জায়গায় নদীটা কোন এক অজানা কারণে অপেক্ষাকৃত পরিস্কার ছিল । হতে পারে, ওই জায়গাটায় গঙ্গা সবচেয়ে কম চওড়া আর স্রোত বেশি বলেই হয়তো জলটা ওখানে বেশি পরিস্কার। অনেক হিসেব করেই রক্সবার্গ সাহেব বাড়ীটা বানিয়েছিলেন। সেই মালিরা সন্ধের মুখে কাজের শেষে, জলে নেমে গা-হাত-পা ধুতে ধুতে চানও করে নিচ্ছিল। সবাই পটাপট ডুব মেরেই উঠে আসছিল, শীতকাল বলে কারো বেশি চান করার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। হঠাৎ বাবলু বলে কমবয়সী একটা ছেলে, ডুব মারতেই চোখের সামনে দিয়ে বেশকিছু ছায়ামূর্তিকে জলের তলা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে। সে তো 'ভূত ভূত' বলে চেঁচিয়ে, তড়িঘড়ি জল থেকে উঠে পড়ল। অন্য ছেলেগুলোও সে কথা শুনে, ভয়ের চোটে হুড়মুড় করে জল থেকে উঠে এল। ওদের কন্ট্রাকটার অরিন্দম ছিল বেশ সাহসী, হাট্টাকাট্টা, একরোখা ছেলে। সে বলল, 'কী দেখেছিস রে বাবলু?' 'দাদা, জলের তলায় ভূত হেঁটে বেড়াচ্ছে। ডুব মেরে আমি স্পষ্ট দেখলাম।', বাবলু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল। 'ধুর,কী দেখতে কী দেখেছিস! চলতো দেখি।', বলে অরিন্দম জামা-প্যান্ট ছেড়ে ওদেরই একজনের গামছা মালকোঁচা মেরে পরে নিল। তারপর গটগট করে জলে নেমে গেল। ডুব দিয়ে জলের ভেতর সামনে তাকিয়ে, ওর নিজেরও চোখ কপালে উঠল। কিছুটা দূরেই, সার দিয়ে একের পর এক হেঁটে চলেছে অসংখ্য মানুষের অবয়ব, জলের ভেতর দিয়ে সামনের দিকে, বেশ দেখা যাচ্ছে। অরিন্দম সব দেখেও কাউকে আর কিছু বলল না। উল্টে সবাইকে খুব ধমকাল, 'চোখের মাথা খেয়েছিস? ওগুলো তো শ্যাওলা।' যা হোক চুপচাপ সবাই সেদিন ফিরে এল। অরিন্দম কিন্তু ঘটনাটার কথা কিছুতেই ভুলতে পারল না। ও পরিস্কার দেখেছে ছায়ামূর্তিদের হেঁটে যেতে। ওরা কারা? কিন্তু জলের ভেতর তো আর অত পরিস্কার দেখা যায় না। সুতরাং ও ঠিক করল, পরের দিন আবার ব্যাপারটা ভাল করে খতিয়ে দেখবে। ও ভাল সাঁতার জানত, পরের দিন ওর এক পরিচিত সাঁতারু বন্ধুর থেকে ও একটা সুইমিং গগলস জোগাড় করে নিল। তারপর বোটানিক্যাল গার্ডেনে চলে গেল। সারাদিন কাজকর্মের শেষে, সেদিন আর মালিরা নদীতে নেমে হাত-পা ধুতে চাইল না, বরং একটা জলের কলেই সেসব সারল। ওদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে, অরিন্দম নিজে এবার জলে নামল। সেদিন ও তৈরি হয়েই এসেছিল। এয়ারটাইট গগলস চোখে পরায় সামনের সবকিছু অনেকটা পরিষ্কারভাবে দেখা যেতে লাগল। ও দেখতে পেল সত্যিই তো, একের পর এক ছায়া-ছায়া হালকা সবুজ রঙের নানা অবয়ব একই দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছে, জলের তলা দিয়ে। আশ্চর্য! বুকটা ছম ছম করে উঠল অরিন্দমের।
ফেরার পথে অরিন্দম সোজা ওদের পারিবারিক এক আধ্যাত্মিক গুরুর কাছে গেল। বাবা-মা স্বামীজীর ভীষণ ভক্ত। মানিকতলায় ওনার আশ্রম, অরিন্দমকেও উনি যথেষ্ট স্নেহ করেন। অরিন্দম আত্মা বিষয়ে কিছু কিছু জানত, মৃত্যুর পর আত্মা অবিনশ্বর থাকে এবং তা দেহ থেকে বেরিয়ে অমৃতলোকে যাত্রা করে। এ কি সেই যাত্রা? নদীর জলের তলায় এখানে সেটা দেখা যাচ্ছেই বা কী করে? তাও আবার সন্ধ্যার পর থেকে? দিনের বেলায় কিছু যে দেখা যায় না, সেটা ও আগেই দেখে নিয়েছে। যা হোক গুরুদেবের কাছে পৌঁছে, ও জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা স্বামীজী, আত্মারা দেহ থেকে মুক্ত হয়ে কোথায় যায়?'
'কোথায় আবার যাবে? পরমাত্মার সাথে বিলীন হতে যায়।'
'কিন্তু সে কি মানুষের অবয়ব ধারণ করে? ছায়া ছায়া?'
'হ্যাঁ, কিন্তু অল্প সময়ের জন্য। অর্জিত পুণ্য বা পাপের কর্মফল ভোগ করার জন্য, স্বর্গ বা নরকে তখন সেই আত্মা যায়। তা শেষ হলে, তবেই সে পরলোকে, মানে পরমাত্মার কাছে যেতে পারে।'
'আর প্রেতাত্মা?'
'প্রেতাত্মা হল এমন এক আত্মা, যে পরমাত্মার কাছে ফিরে যাবার পথ খুঁজে পাচ্ছে না। কর্মফলের দীর্ঘ সাজা ভোগ করছে।'
অরিন্দম আর বিশেষ কিছু প্রশ্ন করল না। তবে গুরুদেবের সঙ্গে কথা বলে, সে এটুকু বুঝতে পারল, যেসব আত্মার চলন সে দেখেছে, তারা প্রেতাত্মা। তারা নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে যাচ্ছে। কিন্তু এমন জিনিস কি জলের তলায় হয়? আর তা এভাবে দেখাও যায়? ভাবতে ভাবতে অনির্বাণ বুঝতে পারল, সে এক বিরলতম দৃশ্য দেখে ফেলেছে, যা কেউ কোনদিন জানত না বা দেখতেও পেত না। জলের তলায় গঙ্গার ঠিক ওই অংশটুকুই প্রেতাত্মাদের নরকে যাবার পথ, যা সে আকস্মিকভাবে আবিষ্কার করে ফেলেছে।
হঠাৎ অরিন্দমের মাথায় একটা মতলব এল। আচ্ছা, এই বিরল দৃশ্য যদি সে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দেয়? আর তার বিনিময়ে, বেশকিছু পয়সাও কামিয়ে ফেলা যাবে। ব্যবসাদারী মন, প্রেতাত্মা দেখিয়ে পয়সা কামানোর বুদ্ধি না হলে আর কী করেই বা কারো মাথায় আসতে পারে? যা ভাবা, সেই কাজ। অরিন্দম ঠিক করল রক্সবার্গ হাউজের সামনে, ঘাটের যে জায়গাটায় ঐরকম প্রেতাত্মাদের চলন দেখা যাচ্ছে, সেই জায়গাটা ভাল করে দেখে নিতে হবে, রক্সবার্গ হাউসটাও। কীভাবে এখানে একটা প্রেতাত্মা দেখানোর ব্যবসা শুরু করা যায়, দেখাই যাক না।
দেখতে দেখতে সে রক্সবার্গ হাউজের বেসমেন্টে গিয়ে পৌঁছল, আর বুঝতে পারল বেসমেন্টের ঘরটা গঙ্গার একদম ধার অব্দি চলে গেছে, যা ঘাটেরও কাছে। সুতরাং এই ঘরটাকেই একটু বাড়িয়ে মডিফাই করে, একদম নদীর ভেতর অব্দি নিয়ে ফেলতে পারলেই কেল্লা ফতে। আর নদীর দিকের দেওয়ালটা ভেঙ্গে, ওয়াটারপ্রুফ মোটা কাঁচ লাগিয়ে দিতে হবে। সবাই এই ঘরে বসে বসেই প্রেতাত্মাদের কাজকারবার দেখতে পারবে। আরও একটা প্ল্যান ওর মাথায় এল। শুধু টিকিট কেটে মানুষকে প্রেতাত্মা দেখানোর জন্য, এই ঘরে বসিয়ে কী লাভ? তার চেয়ে এখানে চেয়ার-টেবিল পেতে একটা পুরোদমে কফিহাউজ বানালে কেমন হয়? লোকে কফি আর পকোড়া খেতে খেতে, বিশাল কাঁচের দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে, নদীর জলে প্রেতাত্মাদের হাঁটাচলা দেখতে পাবে। এ তো একটা ইউনিক আইডিয়া! তবে সবকিছু করতে গেলে, ভাল খরচা আছে। বেসমেন্টটা ভাড়াও নিতে হবে। মডিফাই করতে অনেক টেকনিক্যাল ব্যাপার স্যাপার আছে, দেখা যাক। বি গার্ডেন অথরিটির সঙ্গে ওর ভালই সম্পর্ক, কন্ট্রাক্টও আছে। যদি বাড়িটার বেসমেন্টটা লিজে দিতে ওরা রাজি হন!
কয়েকমাস পরের কথা। আইনি ব্যাপার-স্যাপারগুলো ধীরে ধীরে সেরে ফেলা গেল। তারপর বিশেষ এক কোম্পানির এক্সপার্ট ইঞ্জিনিয়ারদের দিয়ে বেসমেন্টটা জলের ভিতর অব্দি বাড়ানো হল। বিদেশ থেকে এক বিশেষ ধরনের কাঁচ আর আঠাও আনা হল। জলের চাপে যেটা কিছুতেই ভাঙবে না। পুরা কফিহাউজটা বানাতে আর একটা ভৌতিক গা ছমছমে রূপ দিতে বেশ কিছু টাকা লোন হয়ে গেল অরিন্দমের। ও নাম দিল 'হন্টেড রক্সবার্গ কফিহাউস'।
কলকাতার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল এই অদ্ভুত খবরটা। নিউজ চ্যানেল, খবরের কাগজ, ইউটিউবার সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল ওর কফিহাউজে। সবাই এই অভিনব উদ্যোগের কথা ফলাও করে প্রচার করতে লাগল। দিনের বেলা কাঁচের বাইরে মাছেদের খেলা দেখ, আর সন্ধ্যার পর থেকে প্রেতাত্মাদের হাঁটাচলা। কফি হাউস পুরোদমে চালু হয়ে গেল। যথারীতি ভিড় উপচে পড়ল সেখানে। অরিন্দমের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
পরের দিনই বৈজ্ঞানিক, যুক্তিবাদী সমিতি, আধ্যাত্মিক জগতের লোকজন সবাই এসে হাজির হল সেখানে। সবাই এই অদ্ভুত ব্যাপারটা ভাল করে দেখে-বুঝে নিতে চায়। অনেকে আবার ভাবল, এটা কোন আলোর কারসাজি। সবটাই সাজানো ব্যাপার, প্রজেক্টরে এরকম ছবি কাঁচের উপর সুপার ইম্পোজ করে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু তারাও কেউ কিছু ধরতে পারল না। শেষে সবাই রণে ভঙ্গ দিল। দিনের বেলা জলটা বেশ পরিষ্কার থাকে, মাছ আর জলজ প্রাণীদের ঘোরাফেরা বেশ স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু সন্ধ্যা নামতে না নামতেই জলটা ঘোলা হতে শুরু করে, তখন আর মাছ-টাছ বিশেষ দেখা যায় না। কালচে জলের ভিতর দিয়ে, তখন শুধু হালকা সবুজ রঙের মানুষের অবয়বগুলো ফুটে উঠতে শুরু করে। সবাই উত্তর থেকে দক্ষিনে হেঁটে চলেছে নদীর জলের স্রোতের দিকে। ধীরগতির এক চলন, যার কোন শেষ নেই। পুরুষ নারী দলে দলে সব চলেছে, ধীর, স্থির, নিরবচ্ছিন্ন, এক চিরকালীন যাত্রা। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে পুলকিত হতে থাকত খদ্দেররা। কফি হাউজের সব টেবিল বিকালের পর থেকেই ভর্তি হতে শুরু করত। সাতটা বাজতে না বাজতেই হাউসফুল, বাইরেও লাইন পড়ে যেত। অরিন্দম তাই নিয়ম করে দিল, কেউ নতুন অর্ডার আর না করলে, শেষ অর্ডার সার্ভের আধঘণ্টার মধ্যে টেবিল ছেড়ে দিতে হবে। বাইরে অপেক্ষমান কাস্টমারদের জায়গা দিতে হবে, সবাই প্রেতাত্মা দেখার সুযোগ পেতে চায়। খদ্দেররা শিহরিত হতে হতে, কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে, ভূত-প্রেত-আত্মা দেখতে দেখতে চিকেন কাবাবে কামড় লাগাচ্ছে, এ এক অভাবনীয় ব্যাপার। অরিন্দম কফি হাউসে পকোড়া, কাবাব, স্যান্ডউইচ, প্যাটিস, ক্রিমকেক, আইসক্রিম, কোলড্রিংস এরকম অনেক রকম আইটেমও রাখতে শুরু করল। পাশে একটা আলাদা ঘেরা জায়গা আছে, সেখানে তিনটে ছেলে সমানে সেসব বানিয়ে চলেছে। আর সার্ভ করার জন্য চার- পাঁচজন ওয়েটার তো আছেই। একজন ম্যানেজারও রাখতে হয়েছে, সব সামলাবার জন্য। মোটের ওপর ব্যবসাটা একটা বিশাল আকার নিয়েছে, রমরম করে চলছে।
ঠিক তখনই একটা অঘটন ঘটল, যেটা অরিন্দম ভাবতেও পারেনি। একদিন একটা কমবয়সী রোগামত ছেলেকে নিয়ে তার বন্ধুরা এসেছিল, সন্ধের ঠিক আগেই। দেখা গেল ছেলেটা বেশ ভীতু প্রকৃতির, বন্ধুরা তাকে জোর করে ধরে নিয়ে এসেছিল, ভয় দেখাবে বলে। ছেলেটা সন্ধ্যার পর থেকে প্রেতাত্মা দেখা যাবে শুনে, বারবার উঠে যেতে চাইছিল, কাকুতি-মিনতি করছিল। কিন্তু ওর বন্ধুরা নাছোড়, ওকে যেতে দিলে তো? ঠিক সাড়ে ছ'টায় কাচের ওপাশটা ঘোলাটে কালচে হতে শুরু করল, আর আস্তে আস্তে ফুটে উঠতে লাগল প্রেতাত্মাদের অবয়ব। স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে লাগল সব। ছেলেটা ভয়ে বিস্ফোরিত চোখে সেসব দেখল, তারপর পালাতে চেষ্টা করল। কিন্তু ওর বন্ধুরা ওকে জোর করে ধরে রাখল। ছেলেটা যেন বিশ্বাসও করতে পারছিল না ওর নিজের চোখকে। আতঙ্কে, বিস্ময়ে ওর কথা বন্ধ হয়ে গেল, মুখ হাঁ হয়ে গেল। তারপর ছটফট করতে করতে, বুকে হাত চাপা দিয়ে, ছেলেটা ভয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। সেই দেখে সবাই ছুটে এল, ওর বন্ধুরা ওকে ধরে তুলতে চেষ্টা করল। অরিন্দম তাড়াতাড়ি একটা অ্যাম্বুলেন্স ডেকে দিল। ওর বন্ধুরা ওকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে দ্রুত চলে গেল। অরিন্দম একটু বিরক্ত হল, এইসব দুর্বল মনের মানুষদের নিয়েই যত ঝামেলা। এত ভয়ের কি আছে! প্রেতাত্মারা কি কিছু করছে, না ভয় দেখাচ্ছে? যত্তসব! কিন্তু যেটাকে ও ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বলে ভেবেছিল, সেটা ঘোরালো ব্যাপার হয়ে পরের দিন দেখা দিল। ছেলেটা নাকি তখনই হার্টঅ্যাটাকে মারা গেছে। যথারীতি পুলিশ এল কফি হাউসে। অরিন্দম পুলিশকে অনেক করে বোঝাল, কিন্তু কোন লাভ হল না। পুলিশ কফি হাউসটা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেল, তদন্ত হবে। অরিন্দম পড়ল মহাফ্যাসাদে, ওর ব্যবসা যেভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে, তাতে এইভাবে হুট করে পুরো বন্ধ হয়ে গেলে তো সর্বনাশ! ততদিনে অবশ্য ওর বিভিন্ন নেতা, এমএলএদের সঙ্গে ভালরকম চেনাশোনা হয়ে গেছে। অরিন্দম গিয়ে তাদের হাতে-পায়ে ধরল। বেশ কিছু টাকা-পয়সা খসিয়ে, অবশেষে একদিন পরেই আবার কফি হাউসটা খোলার অনুমতি পাওয়া গেল। তবে ভীড় কমাতে হবে, আর রাত ন'টার পর বন্ধ করে দিতে হবে। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল অরিন্দমের।
কিন্তু পরের দিন সন্ধ্যায় যা হল, তার জন্য অরিন্দম কেন, কেউই তৈরি ছিল না। এ জিনিস কখনো ওদের মাথাতেও আসেনি। ঠিক সন্ধ্যার একটু পরে, তখন ভিড় বেড়ে গেছে, সব টেবিল ভর্তি, অর্ডার নিতে আর সার্ভ করতে বয়দের যথারীতি হিমসিম খাবার অবস্থা। অরিন্দম নিজের কেবিনে বসে, কম্পিউটার চালিয়ে কীসব হিসেব দেখছিল। হঠাৎই ধম্ করে কিসের একটা আওয়াছ হল। সবাই সচকিত হয়ে তাকিয়ে দেখে, কাঁচের ঠিক বাইরেই একটা ঘন সবুজ প্রেতাত্মার অবয়ব। এত কাছে তো কোন প্রেতাত্মা, আগে কখনো আসেনি! দেখা গেল প্রেতাত্মাটা ভয়ঙ্কর রাগে কাঁচের উপর হাত দিয়ে আঁচড়াতে লাগল, মাথা দিয়ে, হাত দিয়ে ঠুকতে লাগল। তারপর পাথর তুলে তুলে কাঁচের গায়ে মারতে লাগল। তাতেই দুমদাম, ধুপধাপ নানারকম শব্দ হতে লাগল। আঘাতের চোটে গোটা কাঁচের দেওয়ালটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। কাচের ওপর এই ভয়ঙ্কর আক্রমণ দেখে, লোকজন টেবিল ছেড়ে ততক্ষনে উঠে পড়েছে। এ কী হচ্ছে! এরকম ঘটনা তো তারা কখনও দেখেনি! অরিন্দম নিজের কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে, পুরো ঘটনাটা দেখে, নিজেও হতবুদ্ধি হয়ে গেল। তারপর ভাল করে দেখে ও বুঝতে পারল, আরে! এ তো পরশুর সেই রোগা ছেলেটা, যাকে ভয় দেখানোর জন্য ওর বন্ধুরা এখানে জোর করে ধরে নিয়ে এসেছিল, ফলে যার হার্টঅ্যাটাক হয় এবং এখানেই মারা যায়। এ কি তারই প্রেতাত্মা? তাই এত আক্রোশ? ভাল করে মনে ক'রে, অরিন্দম দেখল, ছেলেটার চেহারার সঙ্গে ছায়ামূর্তি প্রেতাত্মার অবয়ব পুরো মিলে যাচ্ছে। ও কী তবে ওর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এল? সেজন্যই ও জেনে গিয়েছিল কোথা থেকে প্রেতাত্মাদের যাতায়াতের উপর নজর রাখা হচ্ছে? ওদিক কাঁচটা ততক্ষণে আরো জোরে জোরে কাঁপতে শুরু করেছে। অত মোটা কাঁচ, জলের ধাক্কায় কিছুই হবে না। কিন্তু ওই ভাবে পাথর দিয়ে মারতে থাকলে? আশঙ্কায় অরিন্দমের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। দরদর করে ঘামতে লাগল ও। খদ্দেররা ততক্ষণে ওই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না, ভয়ে অনেকে আর্তনাদ করে উঠছে। ওদিকে মুহুর্মুহু আক্রমন চলছে, পাথর, ইঁট, লোহার টুকরো যা হাতের কাছে পাচ্ছে তাই দিয়েই সেই প্রেতাত্মা কাঁচের ওপর পাগলের মত আঘাত হানতে লাগল। একসময় কাঁচে লম্বা ফাটল ধরে গেল। অল্প অল্প জল ঢুকতে শুরু করল। সেই দেখে ভেতরের সমস্ত লোকজন ভয়ে দৌড়াতে শুরু করল দরজার দিকে, কর্মীরাও ভয়ে পালাতে লাগল। ওরা অরিন্দমকে ডাকতে লাগল, চলে আসার জন্য। অরিন্দম তখন ঘটনার আঘাতে স্থানু হয়ে গেছে, মাথা কাজ করছে না। এ কী! এ যে ধ্বংস করে দেবে ওর সাধের কফি হাউস! কিন্তু তখন আর কিছু দেখার সময় নেই। ঝনঝন করে ভেঙ্গে পড়ছে কাঁচ, গঙ্গার জল প্রবল বেগে স্রোতের মত ঢুকে পড়তে শুরু করেছে গোটা ঘরটায়। প্রাণ বাঁচাতে গেলে এখনই পালাতে হবে। অরিন্দম সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত উপরে উঠতে লাগল, পেছনে পড়ে রইল ওর সাধের কফি হাউস। সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে, পিছন ফিরে শেষবারের মত ও দেখতে পেল, সবুজ রঙের সব আত্মাদের অবয়বগুলো, জলে গুলে হালকা সবুজ রঙের একটা রঙের মত ঢুকে পড়েছে গোটা ঘরটায়। জলের স্রোতের সঙ্গে ঘরময় পাক খাচ্ছে সেই সবুজ রঙ।
গোটা বেসমেন্ট আর একতলাটা গঙ্গার জলে ধীরে ধীরে ডুবে গেল। সেই জলের চাপ আর ধাক্কা ফাটিয়ে দিল বাড়িটার দেওয়াল। একেই বহুদিনকার জীর্ণদশা, তার ওপর এই ধাক্কা আর আড়াইশো বছরের পুরোনো বাড়িটা সামলাতে পারল না। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে ধূলিসাৎ হয়ে গেল রক্সবার্গ হাউস, থুড়ি রক্সবার্গ কফি হাউস। ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় আর কেউ কখনো সাহস করে যায়নি, আর গঙ্গার জলে ডুব দিয়েও, আর কোন অবয়বের চলাফেরাও দেখা যায়নি।
(N.B কল্পিত ঘটনা, সত্যি ঘটনার সঙ্গে কোন মিল বা যোগাযোগ নেই।)
Subscribe to:
Posts (Atom)