18 March 2026

রক্সবার্গ হাউজের প্রেতাত্মা

বোটানিক্যাল গার্ডেনের যে অংশটা গঙ্গার একদম ধারে, সেখানেই রয়েছে একটা বহু পুরনো বাড়ি, নাম রক্সবার্গ হাউস। এককালে এখানেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি গাছের চারা আর বীজের স্টোররুম ছিল, আর ছিল উদ্ভিদবিদ্যার উপর বইয়ের এক বিশাল লাইব্রেরী। বাড়িটা প্রায় আড়াইশো বছরের পুরোনো। সতেরোশো সাতাশি সালে মেটিয়াবুরুজের ঠিক উল্টোদিকে গঙ্গার একদম ধারে, এই জায়গাতেই বোটানিক্যাল গার্ডেন তৈরি করা হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্নেল রবার্ট কিডের উদ্যোগে। তারপর সতেরোশো তিরানব্বই থেকে আঠেরোশো চোদ্দো সাল পর্যন্ত এই গার্ডেনের সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিযুক্ত হন উইলিয়াম রক্সবার্গ। তিনিই সতেরোশো চুরানব্বই সালে অসাধারণ স্থাপত্যের এই বাড়িটা নিজের বসবাসের জন্য তৈরি করেছিলেন, পরে অবশ্য এটাকে তিনি বীজ ও চারা সংরক্ষণ এবং লাইব্রেরি হিসেবেও ব্যবহার করতে শুরু করেন। রক্সবার্গ সাহেব সে সময় ভারতীয় উদ্ভিদবিদ্যার একেবারে পথিকৃৎ ছিলেন বলা চলে। তিনি 'ফ্লোরা ইন্ডিকা' বলে একটা বইও লিখেছিলেন, যাকে উদ্ভিদবিদ্যার বাইবেল বললেও কম বলা হয়। কিডসাহেব ওনাকে এই বোটানিক্যাল গার্ডেনের যত্ন নেবার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন। কারণ সাহেব-মেমদের অবসর যাপন আর বৈকালিক ভ্রমণের জায়গা ছিল এই বাগানটা। রক্সবার্গ সাহেব অতি যত্নে, ভারতীয় গাছপালার সমস্ত রকম প্রজাতির সেখানে পালন করার গুরুদায়িত্ব নিয়েছিলেন। প্রায় সাইত্রিশ বছর সেখান থেকে, বোটানিক্যাল গার্ডেনকে তিনি প্রাচুর্যে সাজিয়ে দিয়ে যান। শুরুর সময়কার মাত্র তিনশো প্রজাতির গাছ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রজাতিতে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন। অনেক জাতের চারা তিনি এদেশ থেকে লন্ডনেও পাঠিয়েছিলেন। তবে দুঃখের বিষয়, ব্রিটিশ আমলের শেষে ধীরে ধীরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে, সেই রক্সবার্গ হাউস কালের গর্ভে হারিয়ে গেল। উনিশশো সত্তর সালে বাড়িটা একেবারে ভেঙে পড়ে, দেখলে মনে হত একটা পোড়োবাড়ি। তখনই বোটানিক্যাল গার্ডেনের অথরিটি ওটাকে পরিতক্ত বলে ঘোষণা করেন। তারপরে যদিও বাড়িটাকে হেরিটেজ বিল্ডিং হিসেবে ঘোষণা করা হয়, কিন্তু সরকার সেই সময় সেটাকে রক্ষা করার কোনো উদ্যোগই নিল না। বড় বড় থামগুলো প্রায় ভেঙে পড়ল, চারিদিকে বটের শিকড় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বাড়িটাকে ঢেকে ফেলল, প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হল গোটা বাড়িটা। কিন্তু বছর পাঁচেক আগে, হঠাৎই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। বোটানিক্যাল গার্ডেনের কিছু মালি একদিন কাজের শেষে গঙ্গার ধারে গিয়ে হাত-পা ধুচ্ছিল, রক্সবার্গ হাউজের ঠিক পিছনেই একটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘাট ছিল। ওদের সঙ্গে ছিল ওদেরই কন্ট্রাকটার অরিন্দম সাহা। যদিও গঙ্গার জল কবে থেকেই দূষণে একদম ঘোলাটে হয়ে গেছে , তবুও ওই জায়গায় নদীটা কোন এক অজানা কারণে অপেক্ষাকৃত পরিস্কার ছিল । হতে পারে, ওই জায়গাটায় গঙ্গা সবচেয়ে কম চওড়া আর স্রোত বেশি বলেই হয়তো জলটা ওখানে বেশি পরিস্কার। অনেক হিসেব করেই রক্সবার্গ সাহেব বাড়ীটা বানিয়েছিলেন। সেই মালিরা সন্ধের মুখে কাজের শেষে, জলে নেমে গা-হাত-পা ধুতে ধুতে চানও করে নিচ্ছিল। সবাই পটাপট ডুব মেরেই উঠে আসছিল, শীতকাল বলে কারো বেশি চান করার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। হঠাৎ বাবলু বলে কমবয়সী একটা ছেলে, ডুব মারতেই চোখের সামনে দিয়ে বেশকিছু ছায়ামূর্তিকে জলের তলা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে। সে তো 'ভূত ভূত' বলে চেঁচিয়ে, তড়িঘড়ি জল থেকে উঠে পড়ল। অন্য ছেলেগুলোও সে কথা শুনে, ভয়ের চোটে হুড়মুড় করে জল থেকে উঠে এল। ওদের কন্ট্রাকটার অরিন্দম ছিল বেশ সাহসী, হাট্টাকাট্টা, একরোখা ছেলে। সে বলল, 'কী দেখেছিস রে বাবলু?' 'দাদা, জলের তলায় ভূত হেঁটে বেড়াচ্ছে। ডুব মেরে আমি স্পষ্ট দেখলাম।', বাবলু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল। 'ধুর,কী দেখতে কী দেখেছিস! চলতো দেখি।', বলে অরিন্দম জামা-প্যান্ট ছেড়ে ওদেরই একজনের গামছা মালকোঁচা মেরে পরে নিল। তারপর গটগট করে জলে নেমে গেল। ডুব দিয়ে জলের ভেতর সামনে তাকিয়ে, ওর নিজেরও চোখ কপালে উঠল। কিছুটা দূরেই, সার দিয়ে একের পর এক হেঁটে চলেছে অসংখ্য মানুষের অবয়ব, জলের ভেতর দিয়ে সামনের দিকে, বেশ দেখা যাচ্ছে। অরিন্দম সব দেখেও কাউকে আর কিছু বলল না। উল্টে সবাইকে খুব ধমকাল, 'চোখের মাথা খেয়েছিস? ওগুলো তো শ্যাওলা।' যা হোক চুপচাপ সবাই সেদিন ফিরে এল। অরিন্দম কিন্তু ঘটনাটার কথা কিছুতেই ভুলতে পারল না। ও পরিস্কার দেখেছে ছায়ামূর্তিদের হেঁটে যেতে। ওরা কারা? কিন্তু জলের ভেতর তো আর অত পরিস্কার দেখা যায় না। সুতরাং ও ঠিক করল, পরের দিন আবার ব্যাপারটা ভাল করে খতিয়ে দেখবে। ও ভাল সাঁতার জানত, পরের দিন ওর এক পরিচিত সাঁতারু বন্ধুর থেকে ও একটা সুইমিং গগলস জোগাড় করে নিল। তারপর বোটানিক্যাল গার্ডেনে চলে গেল। সারাদিন কাজকর্মের শেষে, সেদিন আর মালিরা নদীতে নেমে হাত-পা ধুতে চাইল না, বরং একটা জলের কলেই সেসব সারল। ওদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে, অরিন্দম নিজে এবার জলে নামল। সেদিন ও তৈরি হয়েই এসেছিল। এয়ারটাইট গগলস চোখে পরায় সামনের সবকিছু অনেকটা পরিষ্কারভাবে দেখা যেতে লাগল। ও দেখতে পেল সত্যিই তো, একের পর এক ছায়া-ছায়া হালকা সবুজ রঙের নানা অবয়ব একই দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছে, জলের তলা দিয়ে। আশ্চর্য! বুকটা ছম ছম করে উঠল অরিন্দমের। ফেরার পথে অরিন্দম সোজা ওদের পারিবারিক এক আধ্যাত্মিক গুরুর কাছে গেল। বাবা-মা স্বামীজীর ভীষণ ভক্ত। মানিকতলায় ওনার আশ্রম, অরিন্দমকেও উনি যথেষ্ট স্নেহ করেন। অরিন্দম আত্মা বিষয়ে কিছু কিছু জানত, মৃত্যুর পর আত্মা অবিনশ্বর থাকে এবং তা দেহ থেকে বেরিয়ে অমৃতলোকে যাত্রা করে। এ কি সেই যাত্রা? নদীর জলের তলায় এখানে সেটা দেখা যাচ্ছেই বা কী করে? তাও আবার সন্ধ্যার পর থেকে? দিনের বেলায় কিছু যে দেখা যায় না, সেটা ও আগেই দেখে নিয়েছে। যা হোক গুরুদেবের কাছে পৌঁছে, ও জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা স্বামীজী, আত্মারা দেহ থেকে মুক্ত হয়ে কোথায় যায়?' 'কোথায় আবার যাবে? পরমাত্মার সাথে বিলীন হতে যায়।' 'কিন্তু সে কি মানুষের অবয়ব ধারণ করে? ছায়া ছায়া?' 'হ্যাঁ, কিন্তু অল্প সময়ের জন্য। অর্জিত পুণ্য বা পাপের কর্মফল ভোগ করার জন্য, স্বর্গ বা নরকে তখন সেই আত্মা যায়। তা শেষ হলে, তবেই সে পরলোকে, মানে পরমাত্মার কাছে যেতে পারে।' 'আর প্রেতাত্মা?' 'প্রেতাত্মা হল এমন এক আত্মা, যে পরমাত্মার কাছে ফিরে যাবার পথ খুঁজে পাচ্ছে না। কর্মফলের দীর্ঘ সাজা ভোগ করছে।' অরিন্দম আর বিশেষ কিছু প্রশ্ন করল না। তবে গুরুদেবের সঙ্গে কথা বলে, সে এটুকু বুঝতে পারল, যেসব আত্মার চলন সে দেখেছে, তারা প্রেতাত্মা। তারা নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে যাচ্ছে। কিন্তু এমন জিনিস কি জলের তলায় হয়? আর তা এভাবে দেখাও যায়? ভাবতে ভাবতে অনির্বাণ বুঝতে পারল, সে এক বিরলতম দৃশ্য দেখে ফেলেছে, যা কেউ কোনদিন জানত না বা দেখতেও পেত না। জলের তলায় গঙ্গার ঠিক ওই অংশটুকুই প্রেতাত্মাদের নরকে যাবার পথ, যা সে আকস্মিকভাবে আবিষ্কার করে ফেলেছে। হঠাৎ অরিন্দমের মাথায় একটা মতলব এল। আচ্ছা, এই বিরল দৃশ্য যদি সে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দেয়? আর তার বিনিময়ে, বেশকিছু পয়সাও কামিয়ে ফেলা যাবে। ব্যবসাদারী মন, প্রেতাত্মা দেখিয়ে পয়সা কামানোর বুদ্ধি না হলে আর কী করেই বা কারো মাথায় আসতে পারে? যা ভাবা, সেই কাজ। অরিন্দম ঠিক করল রক্সবার্গ হাউজের সামনে, ঘাটের যে জায়গাটায় ঐরকম প্রেতাত্মাদের চলন দেখা যাচ্ছে, সেই জায়গাটা ভাল করে দেখে নিতে হবে, রক্সবার্গ হাউসটাও। কীভাবে এখানে একটা প্রেতাত্মা দেখানোর ব্যবসা শুরু করা যায়, দেখাই যাক না। দেখতে দেখতে সে রক্সবার্গ হাউজের বেসমেন্টে গিয়ে পৌঁছল, আর বুঝতে পারল বেসমেন্টের ঘরটা গঙ্গার একদম ধার অব্দি চলে গেছে, যা ঘাটেরও কাছে। সুতরাং এই ঘরটাকেই একটু বাড়িয়ে মডিফাই করে, একদম নদীর ভেতর অব্দি নিয়ে ফেলতে পারলেই কেল্লা ফতে। আর নদীর দিকের দেওয়ালটা ভেঙ্গে, ওয়াটারপ্রুফ মোটা কাঁচ লাগিয়ে দিতে হবে। সবাই এই ঘরে বসে বসেই প্রেতাত্মাদের কাজকারবার দেখতে পারবে। আরও একটা প্ল্যান ওর মাথায় এল। শুধু টিকিট কেটে মানুষকে প্রেতাত্মা দেখানোর জন্য, এই ঘরে বসিয়ে কী লাভ? তার চেয়ে এখানে চেয়ার-টেবিল পেতে একটা পুরোদমে কফিহাউজ বানালে কেমন হয়? লোকে কফি আর পকোড়া খেতে খেতে, বিশাল কাঁচের দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে, নদীর জলে প্রেতাত্মাদের হাঁটাচলা দেখতে পাবে। এ তো একটা ইউনিক আইডিয়া! তবে সবকিছু করতে গেলে, ভাল খরচা আছে। বেসমেন্টটা ভাড়াও নিতে হবে। মডিফাই করতে অনেক টেকনিক্যাল ব্যাপার স্যাপার আছে, দেখা যাক। বি গার্ডেন অথরিটির সঙ্গে ওর ভালই সম্পর্ক, কন্ট্রাক্টও আছে। যদি বাড়িটার বেসমেন্টটা লিজে দিতে ওরা রাজি হন! কয়েকমাস পরের কথা। আইনি ব্যাপার-স্যাপারগুলো ধীরে ধীরে সেরে ফেলা গেল। তারপর বিশেষ এক কোম্পানির এক্সপার্ট ইঞ্জিনিয়ারদের দিয়ে বেসমেন্টটা জলের ভিতর অব্দি বাড়ানো হল। বিদেশ থেকে এক বিশেষ ধরনের কাঁচ আর আঠাও আনা হল। জলের চাপে যেটা কিছুতেই ভাঙবে না। পুরা কফিহাউজটা বানাতে আর একটা ভৌতিক গা ছমছমে রূপ দিতে বেশ কিছু টাকা লোন হয়ে গেল অরিন্দমের। ও নাম দিল 'হন্টেড রক্সবার্গ কফিহাউস'। কলকাতার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল এই অদ্ভুত খবরটা। নিউজ চ্যানেল, খবরের কাগজ, ইউটিউবার সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল ওর কফিহাউজে। সবাই এই অভিনব উদ্যোগের কথা ফলাও করে প্রচার করতে লাগল। দিনের বেলা কাঁচের বাইরে মাছেদের খেলা দেখ, আর সন্ধ্যার পর থেকে প্রেতাত্মাদের হাঁটাচলা। কফি হাউস পুরোদমে চালু হয়ে গেল। যথারীতি ভিড় উপচে পড়ল সেখানে। অরিন্দমের মুখে হাসি ফুটে উঠল। পরের দিনই বৈজ্ঞানিক, যুক্তিবাদী সমিতি, আধ্যাত্মিক জগতের লোকজন সবাই এসে হাজির হল সেখানে। সবাই এই অদ্ভুত ব্যাপারটা ভাল করে দেখে-বুঝে নিতে চায়। অনেকে আবার ভাবল, এটা কোন আলোর কারসাজি। সবটাই সাজানো ব্যাপার, প্রজেক্টরে এরকম ছবি কাঁচের উপর সুপার ইম্পোজ করে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু তারাও কেউ কিছু ধরতে পারল না। শেষে সবাই রণে ভঙ্গ দিল। দিনের বেলা জলটা বেশ পরিষ্কার থাকে, মাছ আর জলজ প্রাণীদের ঘোরাফেরা বেশ স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু সন্ধ্যা নামতে না নামতেই জলটা ঘোলা হতে শুরু করে, তখন আর মাছ-টাছ বিশেষ দেখা যায় না। কালচে জলের ভিতর দিয়ে, তখন শুধু হালকা সবুজ রঙের মানুষের অবয়বগুলো ফুটে উঠতে শুরু করে। সবাই উত্তর থেকে দক্ষিনে হেঁটে চলেছে নদীর জলের স্রোতের দিকে। ধীরগতির এক চলন, যার কোন শেষ নেই। পুরুষ নারী দলে দলে সব চলেছে, ধীর, স্থির, নিরবচ্ছিন্ন, এক চিরকালীন যাত্রা। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে পুলকিত হতে থাকত খদ্দেররা। কফি হাউজের সব টেবিল বিকালের পর থেকেই ভর্তি হতে শুরু করত। সাতটা বাজতে না বাজতেই হাউসফুল, বাইরেও লাইন পড়ে যেত। অরিন্দম তাই নিয়ম করে দিল, কেউ নতুন অর্ডার আর না করলে, শেষ অর্ডার সার্ভের আধঘণ্টার মধ্যে টেবিল ছেড়ে দিতে হবে। বাইরে অপেক্ষমান কাস্টমারদের জায়গা দিতে হবে, সবাই প্রেতাত্মা দেখার সুযোগ পেতে চায়। খদ্দেররা শিহরিত হতে হতে, কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে, ভূত-প্রেত-আত্মা দেখতে দেখতে চিকেন কাবাবে কামড় লাগাচ্ছে, এ এক অভাবনীয় ব্যাপার। অরিন্দম কফি হাউসে পকোড়া, কাবাব, স্যান্ডউইচ, প্যাটিস, ক্রিমকেক, আইসক্রিম, কোলড্রিংস এরকম অনেক রকম আইটেমও রাখতে শুরু করল। পাশে একটা আলাদা ঘেরা জায়গা আছে, সেখানে তিনটে ছেলে সমানে সেসব বানিয়ে চলেছে। আর সার্ভ করার জন্য চার- পাঁচজন ওয়েটার তো আছেই। একজন ম্যানেজারও রাখতে হয়েছে, সব সামলাবার জন্য। মোটের ওপর ব্যবসাটা একটা বিশাল আকার নিয়েছে, রমরম করে চলছে। ঠিক তখনই একটা অঘটন ঘটল, যেটা অরিন্দম ভাবতেও পারেনি। একদিন একটা কমবয়সী রোগামত ছেলেকে নিয়ে তার বন্ধুরা এসেছিল, সন্ধের ঠিক আগেই। দেখা গেল ছেলেটা বেশ ভীতু প্রকৃতির, বন্ধুরা তাকে জোর করে ধরে নিয়ে এসেছিল, ভয় দেখাবে বলে। ছেলেটা সন্ধ্যার পর থেকে প্রেতাত্মা দেখা যাবে শুনে, বারবার উঠে যেতে চাইছিল, কাকুতি-মিনতি করছিল। কিন্তু ওর বন্ধুরা নাছোড়, ওকে যেতে দিলে তো? ঠিক সাড়ে ছ'টায় কাচের ওপাশটা ঘোলাটে কালচে হতে শুরু করল, আর আস্তে আস্তে ফুটে উঠতে লাগল প্রেতাত্মাদের অবয়ব। স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে লাগল সব। ছেলেটা ভয়ে বিস্ফোরিত চোখে সেসব দেখল, তারপর পালাতে চেষ্টা করল। কিন্তু ওর বন্ধুরা ওকে জোর করে ধরে রাখল। ছেলেটা যেন বিশ্বাসও করতে পারছিল না ওর নিজের চোখকে। আতঙ্কে, বিস্ময়ে ওর কথা বন্ধ হয়ে গেল, মুখ হাঁ হয়ে গেল। তারপর ছটফট করতে করতে, বুকে হাত চাপা দিয়ে, ছেলেটা ভয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। সেই দেখে সবাই ছুটে এল, ওর বন্ধুরা ওকে ধরে তুলতে চেষ্টা করল। অরিন্দম তাড়াতাড়ি একটা অ্যাম্বুলেন্স ডেকে দিল। ওর বন্ধুরা ওকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে দ্রুত চলে গেল। অরিন্দম একটু বিরক্ত হল, এইসব দুর্বল মনের মানুষদের নিয়েই যত ঝামেলা। এত ভয়ের কি আছে! প্রেতাত্মারা কি কিছু করছে, না ভয় দেখাচ্ছে? যত্তসব! কিন্তু যেটাকে ও ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বলে ভেবেছিল, সেটা ঘোরালো ব্যাপার হয়ে পরের দিন দেখা দিল। ছেলেটা নাকি তখনই হার্টঅ্যাটাকে মারা গেছে। যথারীতি পুলিশ এল কফি হাউসে। অরিন্দম পুলিশকে অনেক করে বোঝাল, কিন্তু কোন লাভ হল না। পুলিশ কফি হাউসটা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেল, তদন্ত হবে। অরিন্দম পড়ল মহাফ্যাসাদে, ওর ব্যবসা যেভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে, তাতে এইভাবে হুট করে পুরো বন্ধ হয়ে গেলে তো সর্বনাশ! ততদিনে অবশ্য ওর বিভিন্ন নেতা, এমএলএদের সঙ্গে ভালরকম চেনাশোনা হয়ে গেছে। অরিন্দম গিয়ে তাদের হাতে-পায়ে ধরল। বেশ কিছু টাকা-পয়সা খসিয়ে, অবশেষে একদিন পরেই আবার কফি হাউসটা খোলার অনুমতি পাওয়া গেল। তবে ভীড় কমাতে হবে, আর রাত ন'টার পর বন্ধ করে দিতে হবে। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল অরিন্দমের। কিন্তু পরের দিন সন্ধ্যায় যা হল, তার জন্য অরিন্দম কেন, কেউই তৈরি ছিল না। এ জিনিস কখনো ওদের মাথাতেও আসেনি। ঠিক সন্ধ্যার একটু পরে, তখন ভিড় বেড়ে গেছে, সব টেবিল ভর্তি, অর্ডার নিতে আর সার্ভ করতে বয়দের যথারীতি হিমসিম খাবার অবস্থা। অরিন্দম নিজের কেবিনে বসে, কম্পিউটার চালিয়ে কীসব হিসেব দেখছিল। হঠাৎই ধম্ করে কিসের একটা আওয়াছ হল। সবাই সচকিত হয়ে তাকিয়ে দেখে, কাঁচের ঠিক বাইরেই একটা ঘন সবুজ প্রেতাত্মার অবয়ব। এত কাছে তো কোন প্রেতাত্মা, আগে কখনো আসেনি! দেখা গেল প্রেতাত্মাটা ভয়ঙ্কর রাগে কাঁচের উপর হাত দিয়ে আঁচড়াতে লাগল, মাথা দিয়ে, হাত দিয়ে ঠুকতে লাগল। তারপর পাথর তুলে তুলে কাঁচের গায়ে মারতে লাগল। তাতেই দুমদাম, ধুপধাপ নানারকম শব্দ হতে লাগল। আঘাতের চোটে গোটা কাঁচের দেওয়ালটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। কাচের ওপর এই ভয়ঙ্কর আক্রমণ দেখে, লোকজন টেবিল ছেড়ে ততক্ষনে উঠে পড়েছে। এ কী হচ্ছে! এরকম ঘটনা তো তারা কখনও দেখেনি! অরিন্দম নিজের কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে, পুরো ঘটনাটা দেখে, নিজেও হতবুদ্ধি হয়ে গেল। তারপর ভাল করে দেখে ও বুঝতে পারল, আরে! এ তো পরশুর সেই রোগা ছেলেটা, যাকে ভয় দেখানোর জন্য ওর বন্ধুরা এখানে জোর করে ধরে নিয়ে এসেছিল, ফলে যার হার্টঅ্যাটাক হয় এবং এখানেই মারা যায়। এ কি তারই প্রেতাত্মা? তাই এত আক্রোশ? ভাল করে মনে ক'রে, অরিন্দম দেখল, ছেলেটার চেহারার সঙ্গে ছায়ামূর্তি প্রেতাত্মার অবয়ব পুরো মিলে যাচ্ছে। ও কী তবে ওর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এল? সেজন্যই ও জেনে গিয়েছিল কোথা থেকে প্রেতাত্মাদের যাতায়াতের উপর নজর রাখা হচ্ছে? ওদিক কাঁচটা ততক্ষণে আরো জোরে জোরে কাঁপতে শুরু করেছে। অত মোটা কাঁচ, জলের ধাক্কায় কিছুই হবে না। কিন্তু ওই ভাবে পাথর দিয়ে মারতে থাকলে? আশঙ্কায় অরিন্দমের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। দরদর করে ঘামতে লাগল ও। খদ্দেররা ততক্ষণে ওই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না, ভয়ে অনেকে আর্তনাদ করে উঠছে। ওদিকে মুহুর্মুহু আক্রমন চলছে, পাথর, ইঁট, লোহার টুকরো যা হাতের কাছে পাচ্ছে তাই দিয়েই সেই প্রেতাত্মা কাঁচের ওপর পাগলের মত আঘাত হানতে লাগল। একসময় কাঁচে লম্বা ফাটল ধরে গেল। অল্প অল্প জল ঢুকতে শুরু করল। সেই দেখে ভেতরের সমস্ত লোকজন ভয়ে দৌড়াতে শুরু করল দরজার দিকে, কর্মীরাও ভয়ে পালাতে লাগল। ওরা অরিন্দমকে ডাকতে লাগল, চলে আসার জন্য। অরিন্দম তখন ঘটনার আঘাতে স্থানু হয়ে গেছে, মাথা কাজ করছে না। এ কী! এ যে ধ্বংস করে দেবে ওর সাধের কফি হাউস! কিন্তু তখন আর কিছু দেখার সময় নেই। ঝনঝন করে ভেঙ্গে পড়ছে কাঁচ, গঙ্গার জল প্রবল বেগে স্রোতের মত ঢুকে পড়তে শুরু করেছে গোটা ঘরটায়। প্রাণ বাঁচাতে গেলে এখনই পালাতে হবে। অরিন্দম সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত উপরে উঠতে লাগল, পেছনে পড়ে রইল ওর সাধের কফি হাউস। সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে, পিছন ফিরে শেষবারের মত ও দেখতে পেল, সবুজ রঙের সব আত্মাদের অবয়বগুলো, জলে গুলে হালকা সবুজ রঙের একটা রঙের মত ঢুকে পড়েছে গোটা ঘরটায়। জলের স্রোতের সঙ্গে ঘরময় পাক খাচ্ছে সেই সবুজ রঙ। গোটা বেসমেন্ট আর একতলাটা গঙ্গার জলে ধীরে ধীরে ডুবে গেল। সেই জলের চাপ আর ধাক্কা ফাটিয়ে দিল বাড়িটার দেওয়াল। একেই বহুদিনকার জীর্ণদশা, তার ওপর এই ধাক্কা আর আড়াইশো বছরের পুরোনো বাড়িটা সামলাতে পারল না। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে ধূলিসাৎ হয়ে গেল রক্সবার্গ হাউস, থুড়ি রক্সবার্গ কফি হাউস। ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় আর কেউ কখনো সাহস করে যায়নি, আর গঙ্গার জলে ডুব দিয়েও, আর কোন অবয়বের চলাফেরাও দেখা যায়নি। (N.B কল্পিত ঘটনা, সত্যি ঘটনার সঙ্গে কোন মিল বা যোগাযোগ নেই।)

No comments:

Post a Comment