আমি আবেগ ও অনুভূতিপ্রবণ,ভাবুক আর সৃষ্টিশীল।জীবনের চলা,ওঠাপড়া আর অভিজ্ঞতা নিংড়োনো এই সব লেখা ।এ আমার পাগল মনের নিঃশেষিত প্রকাশ।
18 March 2026
তন্দ্রা এসেছিল
পড়ার টেবিলের ওপর লাফিং বুদ্ধ পেপারওয়েট চাপা দেওয়া ছোট্ট একটা চিরকুট। তাতে লেখা, 'আমার মৃত্যুর জন্য আমি ছাড়া আর কেউ দায়ী নয়। তন্দ্রা।' এই ক'টা লাইনই সেবার বাঁচিয়ে দিয়েছিল সৌগতকে। নইলে ওদের দুজনের অন্তরঙ্গ প্রেম, ঘোরাঘুরি, গোপনে ডায়মন্ড হারবার বা দীঘার ট্রিপ, এসব জানতে কারো বাকি ছিল না। সবাই মৃদু ফিসফাস করছিল, মেয়েটা নাকি সৌগতর জন্যই আত্মহত্যা করতে বাধ্য হল। পুলিশ এসে অবশ্য সৌগতকে রুটিন মাফিক কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করলেও, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ছেড়ে দিয়েছিল। আসলে সেভাবে কোন অভিযোগও জমা পড়েনি। তন্দ্রার বাবা অনেকদিন হল গত হয়েছেন। মাও ক্যান্সারে শয্যাশায়ী। সরল সাদাসিধা তন্দ্রার সঙ্গে প্রেমের খেলা খেলতে দু'বার ভাবেনি সৌগত। ওরকম সুন্দর লক্ষ্মীশ্রী, ওরকম ভরাট চেহারা। কার না নজরে লাগবে? সৌগতর পাঁচ নম্বর শিকার।
দুজনের প্রেম টিঁকে ছিল ঠিক একটা বছর। আসলে বছর বছর প্রেমিকা না বদলালে সৌগতর নিজেকে পাগল পাগল লাগত। বড় চা কোম্পানির সেলস ম্যানেজার হিসেবে তখন ওকে দেশের পূর্ব দিকটা পুরো ঢুঁড়ে ফেলতে হয়। বিশাল মাইনে, নিউটাউনে বড় ফ্ল্যাট। সৌগতর শুধু একটা জিনিসের ভীষণ চাহিদা ছিল, নিত্যনতুন প্রেমিকা। আর সেই প্রেমিকা পুরোনো হয়ে যেত মাত্র ক'দিনের মধ্যেই।
সেই সন্দেহ থেকেই ওদের সম্পর্কের শুরুর দিকে একদিন তন্দ্রা কাতরভাবে বলেছিল, 'তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না তো?'
'না গো। তাই আবার হয় নাকি?', সহজভাবে বলল সৌগত।
'তাহলে আগে যে তোমার অন্য অনেক প্রেমিকা ছিল শুনলাম, তাদেরকে ছেড়ে দিলে কেন?'
'আরে না না। তারা ঠিক প্রেমিকা ছিল না। জাস্ট একটা ক্রাশ আর কি। তাছাড়া আমার সঙ্গে ঠিক মনেরও মিল হচ্ছিল না, বুঝলে?'
'তাই নাকি?আর আমার সঙ্গে মনের মিল হয়েছে তো?না আমাকেও সময় হলে ওদেরই মতো ছুঁড়ে ফেলে দেবে?'
'ওঃ, তুমি থামবে?এরকম কথা আর কখনো বলবে না, বুঝেছ? তুমি জানো না, তোমাকে আমি কতটা ভালবাসি। নিজের থেকেও বেশি।', বাঁধা বুলি আউড়ে গিয়েছিল সৌগত। এসব অভিনয় ও ভালই পারে। তবে ওর আসল উদ্দেশ্য হল টাইমপাস। সেটা তন্দ্রা আর কী করে জানবে? বোকা মেয়ে।
সুতরাং যা হবার তাই হল। তন্দ্রাও সৌগতর নোংরা খেলায় কোন ব্যতিক্রম হতে পারেনি। এক বছরের মাথাতেই তন্দ্রাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল সৌগত। নাম্বার ব্লক করে দিল, ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপেও ব্লক। সব জেনে বুঝে, কিছুদিন তন্দ্রা খুব কান্নাকাটি করেছিল। কিন্তু হাজার হলেও মেয়ে তো, কোথায় যেন ওর বাধছিল। কীভাবে ফেরাবে সৌগতকে, তা ওর জানা ছিল না। শুধু অসহ্য যন্ত্রণা ওকে দিনরাত কুরে কুরে খেত। অস্তিত্বের সংকট নিয়ে আর কতদিন বেঁচে থাকা যায়? জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে উঠল তন্দ্রার। তারপর যখন ওর বান্ধবী স্বরলিপি একদিন ওকে জানাল সৌগতর নতুন গার্লফ্রেন্ডের কথা, তখন নিমেষের মধ্যে পৃথিবীটা ওর সামনে দুলে উঠেছিল। হঠাৎ করে সুইসাইডের সিদ্ধান্তটা তখনই নিয়ে নিয়েছিল তন্দ্রা। সিলিং ফ্যানের থেকে ওর শরীরটা যখন গলার ওড়নার ফাঁসে দুলছিল, তখন নাকি ওকে বীভৎস দেখাচ্ছিল।
সৌগত তারপর থেকে বহুদিন আর ঐ তল্লাট মাড়ায়নি। তবে শুনেছিল তন্দ্রার মার আছারি পিছারি খাওয়া কান্না আর বারবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ওর তখন অতশত ভাববার সময় ছিল না। সিক্তার প্রেমে তখন ও হাবুডুবু খাচ্ছে। দু'তিনবার ডেটিংও হয়ে গিয়েছে। সিক্তার চেহারাটা ঠিক চাবুক, তন্দ্রার মত ম্যাদামারা নয়। ক'মাস পরে সৌগতর কানে এসেছিল, তন্দ্রার মাও নাকি মারা গেছেন। ক্যান্সারের লাস্ট স্টেজ না মেয়ের মৃত্যুশোক, সে সব জানার প্রয়োজন বা ইচ্ছে কোনটাই ছিল না সৌগতর। তন্দ্রার কথা ও যথারীতি ভুলে গিয়েছিল আর মেতে উঠেছিল সিক্তার সঙ্গে 'গভীর' প্রেমে।
এই ভাবেই কেটে গিয়েছিল কয়েকটা মাস। হঠাৎ একদিন সৌগতর সামনে একটা সুযোগ এসে গেল। শিলিগুড়িতে ওর উত্তরবঙ্গের সব ক্লায়েন্টদের নিয়ে বেশ ক'টা মিটিং ছিল। সেই সুযোগটা ও কাজে লাগাতে চাইল সিক্তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ ডেটে। ওদিকে সৌগতর কলিগ তথা বন্ধু আকাশের মাত্র মাসখানেক আগে বিয়ে হয়েছে। তাই প্রস্তাবটা সৌগতই দিয়েছিল আকাশকে, 'কী রে, সামনের সপ্তাহে সেলস ট্যুরে শিলিগুড়ি যাবি নাকি আমার সঙ্গে?'
'না রে। তুই একাই যা। বড়সড় ব্যাপার।'
'ধুর, এবারে আলাদা। অ্যাকাউন্টসেরও একজন যাবে। আমি বললেই বস তোকে আমার সঙ্গে যেতে বলবে। তোর তো হানিমুনটারও ঠিকমতো সুযোগ হয়নি। এই সুযোগে স্বর্ণালীকে নিয়ে চল না। আমিও সিক্তাকে নিয়ে যাব।'
'সেটা অবশ্য ভালই বলেছিস। কিন্তু যাবি কোথায়?সেই দার্জিলিং?ও তো একঘেয়ে হয়ে গেছে। ঠান্ডা কই?'
'না রে। এবারে একটা অন্য জায়গায় যাবার প্ল্যান করেছি, লেপচাজগৎ। শিলিগুড়ি থেকে মাত্র দেড় ঘন্টার রাস্তা। পাহাড়ের উপর একটা অখ্যাত গ্রাম। ইদানিং ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে অবশ্য বেশ নাম করেছে, তবে এখনও সেরকম ভিড়ভাট্টা নেই।'
'তাই নাকি?'
'হুঁ, এরকম পাহাড়ের মেঘ রোদের মধ্যে রোমান্টিক ক'টা দিন কাটানোর সুযোগ কি আর ছাড়তে ইচ্ছে হয়? হাজার হলেও প্রেমিকমন তো! '
'সে তো বটেই। তা কি আর জানি না?', চোখ টিপল আকাশ, 'তা থাকবি কোথায়?'
'থাকার জায়গা বলতে মাত্র কয়েকটা হোমস্টে। তবে শিলিগুড়িতে ধীরেন বলে আমার একজন চেনাজানা আছে। ওর সঙ্গে আমার সব কথাবার্তা হয়ে গেছে, ওই সব বুকিং করে দেবে। তুই শুধু 'হ্যাঁ' বললেই হল।'
'নতুন জায়গা। কেমন হবে কে জানে?'
'নতুন জায়গা মানে? অসাধারণ জায়গা। চারপাশে ঘন জঙ্গল,ঝরনা, নদী, চা বাগান। পাশেই অসাধারণ ভিউ পয়েন্ট থেকে সানরাইজ দেখার সুযোগ আর তার সঙ্গে কপাল ভাল হলে ঘরের জানলা দিয়েই কাঞ্চনজঙ্ঘার দুর্দান্ত ভিউও পাবি।'
'ওঃ, তাহলে তো দারুণ হবে। চল তাহলে, ঘুরেই আসি।চারজনে মিলে বেশ জমে যাবে পুরো ট্যুরটা।', আকাশ রাজি হয়ে গেল।
দিন দুয়েকের সেলস মিটিং, ক্লায়েন্ট মিটিং, রিপোর্টিং সব সেরে, লেপচাজগৎ পৌঁছে তো ওরা দারুন খুশি। চারজনে একেবারে তুরীয় আনন্দে মেতে উঠল। আকাশ শিলিগুড়ি থেকে কিনে এনেছিল বেশ কটা হুইস্কির বোতল। ওরা মস্তির শেষ কণাটুকু শুষে নিতে চাইল দুটো দিন।
সেদিন দুপুরে জানলা দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার স্লিপিং বুদ্ধও দেখা যাচ্ছিল পরিস্কার। যাকে বলে একেবারে সোনায় সোহাগা। খেয়েদেয়ে সৌগত বলল, 'এখানে একজন লোকাল গাইড আছে, 'ডিকি'। যাবি নাকি ওর সঙ্গে পাইন বনের মধ্যে ট্রেকিং করতে?'
আকাশ তো এক কথায় রাজি, 'হ্যাঁ নিশ্চয়ই যাব। ঘরে বসে বসে কি আর প্রকৃতিকে উপভোগ করা যায়?'
সিক্তা আর স্বর্ণালীও সেই সুরে সুর মিলিয়ে বলে উঠল, 'আমরাও যাব।' ওরা দুজনেও এই ক'দিনে বেশ ভাল বন্ধু হয়ে গেছে। গল্প যেন শেষই হতে চাইছে না। চারজনই গাইড ডিকিকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
একটু রাস্তা যেতেই, হঠাৎ স্বর্ণালী সবাইকে ছাড়িয়ে আগে আগে চলতে শুরু করল। আকাশ চেঁচিয়ে বলে উঠল,' আরে একটু আস্তে চল না। ডিকিকে আগে যেতে দাও।'
'না, এখানে আমি আগে এসেছি, সব চিনি। কোন অসুবিধা হবে না।', স্বর্ণালী জোর দিয়ে বলে এগিয়ে গেল। আকাশ আর কিছু বলতে পারল না। কিন্তু ও মনে মনে একটু অবাক হল, স্বর্ণালী তোকখনো বলেনি যে ও লেপচাজগতে আগে এসেছিল, আশ্চর্য! যাই হোক, জঙ্গলের ভেতরে বড় বড় পাইন গাছের মধ্যে দিয়ে নরম পাতা বিছানো পায়ে চলা সরু একটা পথ ধরে ওরা চলতে লাগল। সেটা এঁকেবেঁকে চলে গেছে একটা পাহাড়ী ঝরনার দিকে। ওর জল নাকি ভীষণ উপকারী। ওষুধের মতো কাজ করে বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। তারা ঐ ঝরনাকে দেবতার মত পুজোও করে। ঝরনা দেখে ওখান থেকেই একটা পায়ে চলা পাহাড়ি রাস্তা ধরে ওরা ট্রেক করে ফিরে আসবে সোজা হোমস্টেতে, এরকমই প্ল্যান।
কিন্তু স্বর্ণালী ওরকম হন্তদন্ত হয়ে চলেছে কেন? সৌগত আর আকাশ বেশ অবাক হচ্ছিল। ওরা একটু পিছিয়ে পড়েছিল, কারণ মাঝে মাঝেই সিক্তা ছবি তোলার জন্য দাঁড়াতে, ওদেরও দাঁড়াতে হচ্ছিল। লোকাল গাইড ডিকি গোর্খা ছেলে, সে এই জঙ্গলটা হাতের তালুর মতো চেনে। সে পর্যন্ত স্বর্ণালীর সঙ্গে হাঁটায় পেরে উঠছিল না, বাকিদের পথ দেখাতে গিয়ে। হঠাৎ একটা জঙ্গলের বাঁকে কতগুলো গাছের আড়ালে স্বর্ণালী হারিয়ে গেল। ডিকি আর তার ঠিক পেছনে থাকা সৌগত তড়িঘড়ি এগিয়ে গিয়ে দেখল, একটু দূরে স্বর্ণালী সাদাকালো সোয়েটার পরা আর একটা মেয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা খুব যে ভালমতো ঠাহর করে দেখেছিল তা নয়, কিন্তু স্বর্ণালীর সঙ্গে কেউ একটা যে ছিল, সেটা নিশ্চিত। এই জঙ্গলে আবার কোন মেয়ে এসে উদয় হল! কোত্থেকেই বা এল! ওরা তো অবাক। ওদিকে স্বর্ণালী হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল ওদের অপেক্ষায়। ওর কাছে পৌঁছে, ডিকি আর সৌগত অবাক হয়ে দেখল স্বর্ণালী একাই দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর কেউ আশেপাশে কোথাও নেই। আরে সেই মেয়েটা কোথায় গেল? 'এখানে কে ছিল তোমার সঙ্গে?', সৌগত জিজ্ঞেস করল।
'কে আবার থাকবে? কেউ না তো?', সটান বলে দিল স্বর্ণালী।
'তার মানে? আমরা যে দূর থেকে আরও একটা মেয়েকে তোমার সঙ্গে দেখলাম বলে মনে হল।' , সৌগত অবাক হয়ে বলল।
'ভুল দেখেছ।', স্বর্ণালী রেগে বলল। কিন্তু ওর চোখ দুটো তখন বেশ অন্যরকম লাগছিল। কীরকম যেন একটা নেশার ঘোরের মতো ঘোলাটে অথচ ভাঁটার মতো জ্বলছিল। সঙ্গে একটা রাগ রাগ ভাব, যেন ভস্ম করে দেবে ওদের সকলকে। সৌগত আর বেশি কথা বাড়াল না। অন্যরাও কেউ কিছু বুঝতে পারল না। সৌগত বাধ্য হয়ে পুরো ব্যাপারটা চেপে গেল। কিন্তু ডিকি অন্যদের আড়ালে ওকে ডেকে, চাপা স্বরে বলল, 'আপনি আর আমিই তো সবার আগে ছিলাম, বলুন। আমিও কিন্তু স্পষ্ট দেখেছি আর একটা মেয়ে ছিল ম্যাডামের সঙ্গে, তাই না?'
'হ্যাঁ, তাই তো মনে হল। কিন্তু...'
'এই জঙ্গলে মেয়েটা কোথায় হারিয়ে গেল, বলুন?আশেপাশেও কোথাও দেখলাম না। কোথাও তো লুকোবার জায়গাও ছিল না, তবে?'
'সত্যিই তো!মেয়েটা একেবারে গায়েব হয়ে গেল!'
'ম্যাডামও মিথ্যে বলল, যে কেউ ছিল না। আমার কিন্তু একটু অন্যরকম লাগছে পুরো ব্যাপারটা। চলুন জলদি ফিরে যাই।', ডিকি একটা কিছু আঁচ করে ভয়ে ভয়ে বলল। সৌগতও সায় দিল। ঝরনাটা দেখেই সেদিন ওরা তাড়াতাড়ি ফিরে এল নিজেদের হোমস্টেতে।
ফেরার পথে সৌগত আর আকাশ মিলে ঠিক করল পরের দিন ভোর পাঁচটাতেই ওরাঘুম থেকে উঠে পড়বে। তারপর ভিউপয়েন্ট থেকে সানরাইজ দেখবে। ওই সময়টা কাঞ্চনজঙ্ঘাও খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। আজই শেষ দিন, সুতরাং এই সুযোগটা কিছুতেই ছাড়া যাবে না।
সন্ধ্যেবেলায় হোমস্টেতে বনফায়ারের ব্যবস্থা হল। কাঠের ধিকিধিকি আগুনে মুরগির রোস্ট আর দার্জিলিং চা। সবাই নাচে, গানে, হুল্লোড়ে মেতে উঠল। এরই মধ্যে মোবাইলটা চার্জ দিতে সৌগতকে একবার ঘরে যেতে হল। ঘরে ঢুকতেই হঠাৎ চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। এখানে এরকম ঘনঘন পাওয়ার কাট খুব স্বাভাবিক ঘটনা। যাই হোক, সৌগত ঘর থেকে বেরোতে যাবে, হঠাৎ বনফায়ারের মৃদু আলোয় ওর যেন মনে হল, সিক্তা চুপি চুপি এসে ওকে পেরিয়ে ছায়ার মতো ঘরে ঢুকে গেল, কোন কথা না বলেই। সিক্তা আবার কী করতে ঘরে ঢুকল, ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সামনে তাকাতেই সৌগত চমকে উঠল। দেখে সামনেই একটু দূরে সিক্তা, স্বর্ণালী আর আকাশ আগুনের পাশে বসে হৈ-হুল্লোড়ে ব্যস্ত। ঠিকই, ঐ তো গোলাপি জ্যাকেট পরে সিক্তা। তবে ওর পাশ দিয়ে ঘরে কে ঢুকল? সৌগতর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আর ঠিক তখনই আবার কারেন্ট চলে এল। সৌগত ঘরের মধ্যে তাকিয়ে দেখল ঘরে কেউ নেই, এমনকি বাথরুমেও কেউ নেই। তাহলে ও কাকে দেখেছিল? সিক্তার মতনই চেহারা, অথচ সিক্তা নয়। আতঙ্কে ওর গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। কোনরকমে ঘর বন্ধ করে বাইরে গিয়ে ও বাকিদের পুরো ব্যাপারটা বলল।
'তুই ভুল দেখেছিস, এ হতেই পারে না।', আকাশ জোর দিয়ে বলল।
'আলবাৎ দেখেছি।', সৌগতও জেদ ধরল।
'ওঃ, তুইও না! ওসব পুরো মনের ভুল।', আকাশ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল ব্যাপারটা।
'না রে, আমি স্পষ্ট দেখেছি। কেমন যেন ছায়া-ছায়া একটা মেয়ের অবয়ব। আমার পাশ দিয়ে চলে গেল।', সৌগত ঘোর লাগা গলায় বলল।
'আরে ছাড়ো তো! অন্ধকারে ওরকম কত কী মনে হয়।', সিক্তা বলল।
'আরে চিল করো চিল। নেশার ঘোরে কী না কী দেখেছ, ঐ নিয়ে এখন মুড অফ কোরো না প্লিজ।', স্বর্ণালীও বলল। সবাই মিলে সৌগতকে একটা চেয়ারে বসিয়ে ধাতস্থ করল। কিন্তু সেই সন্ধ্যায় সৌগতর খটকাটা আর কিছুতেই যাচ্ছিল না।
যাই হোক, রাতে খাওয়া দাওয়ার পর ওরা যে যার ঘরে ঢুকে গেল। সৌগতদের ঘরের ডানপাশেই আকাশদের ঘর, কমন কাঠের পার্টিশন।। যথারীতি উদ্দাম রাতের পর সবাই শুয়ে পড়ল। আর শুতেই সৌগত গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। ও আগেই আকাশকে বলে রেখেছিল, যে ভোরে আগে উঠবে, সে যেন ওদের কমন পার্টিশনে তিনবার নক করে। কারণ সানরাইজ দেখতেই হবে। এখানে মোবাইল টাওয়ারের কোন ঠিক ঠিকানা নেই, যে মোবাইলে মিস কল দেবে। আর চার্জ দেওয়ার অসুবিধা বলে, ওরা মোবাইল রাতে অফ করেই রাখছিল।
হঠাৎ গভীর রাতে ঘুমের মধ্যেই সৌগতর মনে হল, ওদের ঘরের দরজায় কে যেন নক করল, পরপর তিনবার। টক্ টক্ টক্। নিশ্চয়ই আকাশ, নেশার ঘোরে ব্যাটার আর কোন সময়জ্ঞান নেই। ওর তো ভোর পাঁচটায় নক করার কথা। ভাবতে ভাবতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সৌগত। ওর তখন আর ওঠার ক্ষমতা ছিল না, এমনই ঘোর। তবু বুঝেছিল, তখন প্রায় মাঝরাত। আকাশের নক করার কথাই নয়।
পরেরদিন ভোরে ওরা চারজন সূর্যোদয় দেখতে উঠে, সৌগত আকাশকে মজা করে বলল, 'কী রে, কাল মাঝরাতে আমাদের দেওয়ালে নক করছিলি কেন? তোকে তো ভোর পাঁচটায় বলেছিলাম।'
'আমি? আমি আবার কখন তোদের ঘরে নক করতে গেলাম। কী সব ভুলভাল বলছিস?', আকাশ অবাক হয়ে বলল। শুনে সৌগত বেশ দমে গেল। তবে কি ঘুম আর নেশার ঘোরে ও ভুল শুনেছে? কিন্ত ওকে অবাক করে দিয়ে সিক্তাও বলে উঠল, 'না না, আমিও শুনেছি। তবে দেওয়াল নয়, খাদের দিকের জানলার কাঁচে নক করার শব্দ। তখন অনেক রাত। তিনবার নক করেছিল, টক্ টক্ টক্।'
'বল কী? মাঝের পার্টিশানের দিক থেকে নয়?' সৌগত আরো অবাক।
'না, খাদ আর জঙ্গলের দিকে যে জানলাটা ছিল সেইটায় করেছিল। কিন্তু তখন এত গভীর ঘুম, যে আমার আর ওঠার সাধ্য ছিল না।', সিক্তা মনে করে বলল।
'ভাল করেছিস তোরা উঠিসনি। তোদের কপাল ভাল, যে তোরা উঠতে পারিসনি। ওটা নিশ্চয়ই নিশির ডাক ছিল।', স্বর্ণালী বলল।
'ধুর, কী যে বলো!', সৌগত হেসে বলল।
'না গো, পাহাড়ে এরকম হয়। নিশি এসে ডেকে নিয়ে যায় জঙ্গলে, খাদের গভীরে। যে যায়, সে আর কোনদিন ফিরে আসে না। আমি জানি।', স্বর্ণালী অদ্ভুত গলায় বলল।
'তোদের কারোর নেশা কাটেনি মনে হচ্ছে, এখনো সবার হ্যাংওভার রয়েছে।', আকাশে হেসে বলল।
হঠাৎ সৌগতর কী একটা মনে পড়ে যেতে, ও জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা স্বর্ণালী, তুমি কালকে কী করে জঙ্গলের মধ্যে সবার আগে আগে রাস্তা চিনে যাচ্ছিলে? এসব রাস্তাঘাট চিনতে?আগে কবে এসেছিলে?'
'আগে? কই, আগে তো কখনো আসিনি!', স্বর্ণালী অবাক হয়ে বলল। অথচ গতকাল ওই বলেছিল, এখানে আগে এসেছে, সব চেনে, জানে। আর সত্যিই জঙ্গলের মধ্যে ওর হাঁটাচলা অদ্ভুত ভাবে বদলে গিয়েছিল। সত্যিই যেন ঐ জায়গাটা ও খুব ভাল করে চেনে বলে মনে হচ্ছিল। অথচ আজ সরাসরি অস্বীকার করছে। সৌগত বেশ অবাক হল। কালকে ঘরে ঢোকা অজানা নারীর অবয়ব, জঙ্গলের মধ্যে এক ঝলক দেখা আর গায়েব হয়ে যাওয়া মেয়েটা, তার ওপর মাঝরাতে দরজা নক করার ব্যাপারগুলো মিলিয়ে, ওর সন্দেহটা আরো বাড়িয়ে দিল। কে এসেছিল? তবে কি...?
ওদিকে অন্ধকার থেকে তখন আলো ফুটে উঠেছে। পাহাড়ের এক কোণে সূর্য উঠছে আর নিচের দিক থেকে মেঘ আর ছোট ছোট পাহাড়ের চূড়ার মধ্যে সেই আলোর হাল্কা বিচ্ছুরণ দেখে মনে হচ্ছে যেন সমুদ্রের ঢেউ উঠছে। এক অপার্থিব, অবর্ণনীয় দৃশ্য। তারই মধ্যে হঠাৎ উজ্জ্বল সোনালী রঙে জ্বলে উঠে দৃশ্যমান হয়ে উঠল কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জ। পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কিছু আছে বলে ওদেরতখন মনে হচ্ছিল না। ওরা মুগ্ধ, নিশ্চুপ হয়ে প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য দেখে মোহিত হয়ে যাচ্ছিল।
ব্রেকফাস্ট শেষে ফেরার পালা। হঠাৎ সৌগতর বিদ্যুৎচমকের মত একটা কথা মনে পড়ে গেল। সাদাকালো সোয়েটারটার কথা। কাল জঙ্গলে আবছাভাবে ওর মনে হয়েছিল স্বর্ণালীর সঙ্গের মেয়েটা, যে জঙ্গলে হঠাৎ গায়েব হয়ে গেল, তার গায়ে একটা সাদাকালো সোয়েটার ছিল। অথচ ঠিক এইরকমই একটা সোয়েটার তন্দ্রা পড়ত না? হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিকই তো। ওর সব স্পষ্ট মনে পড়ে গেল। সাদাকালো বড় বড় স্ট্রাইপওলা ফুলহাতা সোয়েটারটা তন্দ্রাকেই পরতে দেখেছিল ও শীতকালে। সৌগত মজা করে বলত, 'তুমি কি জেব্রা?' তাহলে এর মানে কী দাঁড়াচ্ছে? তন্দ্রা এসেছিল?একটা ঠান্ডা অনুভূতির স্রোত নেমে গেল সৌগতর শিরদাঁড়া বেয়ে। এই ঠান্ডাতেও ও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামতে লাগল। তবে কি সত্যিই কাল তন্দ্রা এসেছিল? জঙ্গলে, ঘরের মধ্যে? রাতেও কি খাদের দিক থেকে ওই এসে জানালায় নক করেছিল? কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব?সৌগত ভাবতে লাগল। কেনই বা ও ফিরে এসেছিল?ওকে কি কিছু বলতে চায়?তবে কি তন্দ্রা ওর পিছু ছাড়েনি?ওকে শাস্তি দিতে চায়?কিন্তু... কিন্তু তন্দ্রা তো মরে গেছে। না, না, এসব নিশ্চয়ই ওর মনের দুর্বলতা, মনের ভুল। ও সব ভুল ভাবছে। কিন্তু তাই বা কী করে হয়? ও তো একা নয়! ডিকিও জঙ্গলে অন্য মেয়েটাকে দেখেছিল। সিক্তাও শুনেছিল জানালায় নক করার শব্দ। স্বর্ণালীকে কাল অন্যরকম লাগছিল কেন? অথচ স্বর্ণালী আজ সব অস্বীকার করছে। সৌগতর কাছে পুরো ব্যাপারটাই একটা ধোঁয়াশা হয়ে রয়ে গেল।
ফিরে আসার সময় গাড়িতে বসে, সৌগতর দূরের পাহাড় আর জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হল, ওকে নিজেকে বদলাতে হবে। নইলে ও কোনদিন মুক্তি পাবে না, ওকে বদলাতেই হবে। হঠাৎ আদর করে সিক্তার চুলে হাত বোলাতে লাগল ও। জীবনে প্রথমবার ওর কাউকে মন থেকে ভাল লাগছে। সৌগতর চোখে জল এসে গেল।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment