আমি আবেগ ও অনুভূতিপ্রবণ,ভাবুক আর সৃষ্টিশীল।জীবনের চলা,ওঠাপড়া আর অভিজ্ঞতা নিংড়োনো এই সব লেখা ।এ আমার পাগল মনের নিঃশেষিত প্রকাশ।
18 March 2026
সমর্পণ
কোম্পানির সেলস হেড অফিসে হঠাৎ ট্রান্সফার হয়ে, সন্দীপনের পোস্টিং হয়ে গেল টাটায়। হাওড়ায় স্টকইয়ার্ডের আরামের চাকরি, বাড়ি থেকে যাতায়াতের সুবিধা, বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, মা-বাবা-আত্মীয়-স্বজন পরিবৃত নিরুপদ্রব জীবনটাকে উপড়ে নিয়ে, কমলিকা আর একমাত্র মেয়ে সোহিনীকে নিয়ে চলে যেতে হল জুবিলি পার্কের উল্টো দিকে কোম্পানির দু' কামরার কোয়ার্টারে।
প্রথম প্রথম কলকাতা শহর, বন্ধুবান্ধব আর বাবা-মার জন্য ওর বেশ মন কেমন করত। কিন্তু ধীরে ধীরে সব অভ্যাস হয়ে গেল, নতুন বন্ধু-বান্ধবও হল বেশ কিছু। টাটা সামাজিক জীবন যাপনের পক্ষে বেশ সমৃদ্ধ জায়গা, আধুনিক সমস্ত সুযোগ সুবিধাই সেখানে মজুত। তবে এই নতুন ডিপার্টমেন্টে কাজের চাপ অনেকটাই বেশি। প্রায় প্রতিদিনই বাড়ি ফিরতে রাত সাড়ে সাতটা-আটটা বেজে যায়। তবে তারই মধ্যে, সন্দীপন প্রতি উইকএন্ডে, কমলিকা আর সোহিনীকে নিয়ে কোনও না কোনও জায়গায় বেড়াতে যায়, বাইরে খাওয়া দাওয়াও সারে। মনটা যাতে যান্ত্রিক না হয়ে পড়ে, একটু ফ্রেশ হয়ে ওঠে, তার জন্য সব চেষ্টাই ও করে।
কিন্তু কমলিকার থেকে কিছু যেন একটা ঠিকমত পাচ্ছিল না সন্দীপন। সত্যিই কি পাচ্ছিল না? নাকি কমলিকাকে ততদিনে একঘেয়ে লাগতে শুরু করেছিল? হতেও পারে। তাই কাজের টেনশন থেকে মুক্তি পেতে, ও গোপনে ফেসবুকে বান্ধবী খুঁজতে শুরু করল। খুঁজতে খুঁজতে বেশ কিছু বান্ধবী জুটেও গেল। ওর উদ্দাম প্রেম আর যৌনতার খিদেকে সামাল দেবার সাধ্য হয়ত তখন কমলিকার ছিল না। ও এক নিতান্ত ঘরোয়া, সাধারণ আর একঘেয়ে বিয়ে করা বৌ মাত্র। আর সন্দীপন তখন নেশায় পাগল হয়ে খুঁজছে মনের মত নতুন এক বান্ধবী। ঠিক সেই সময়ে, ও যেমনটি চাইছিল, তেমনটাই পেয়ে গেল ওর ফেসবুক ফ্রেন্ড স্বর্ণালীর মধ্যে। ওরা হয়ে উঠল একে অপরের ফোনফ্রেন্ড থেকে বেস্টফ্রেন্ড।
'তুমি আজকাল বড্ড ফোন নিয়ে ব্যাস্ত থাক, আমার সঙ্গে কথা বলার সময়ই পাও না।', একদিন মৃদু অনুযোগ করে কমলিকা।
'কী করব বল? অফিসের এত ফোন আসে! সব কাজের ব্যাপার।', সন্দীপন আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করে।
'অফিসের ফোন তো আড়ালে গিয়ে কথা বলার কী আছে? আমার সামনেও তো বলতে পার। কী এমন গোপন কথা?', সন্দেহ মনে লুকিয়ে বলেই ফেলে কমলিকা।
সন্দীপন ঢোঁক গেলে। কমলিকা কি কিছু সন্দেহ করেছে? মুখে স্মার্টনেস এনে শুধু বলে, 'আরে, আড়ালের কী আছে? অফিসের কূটকচালি তোমার শুনতে ভাল লাগবে না, তাই।'
কমলিকা আর বেশি কথা বাড়ায় না। ও ভীষণ সরল মনের মেয়ে, সন্দীপনকে প্রাণ মন দিয়ে ভালবাসে, বিশ্বাস করে। সন্দীপনের এইসব নতুন ফেসবুক ফ্রেন্ড বা ফোনফ্রেন্ডদের সঙ্গে যৌনতামাখা রগরগে আলাপের কথা জানতে পারলে, হয়তো ও লজ্জায় ঘৃণায় আত্মহত্যা পর্যন্ত করে ফেলতে পারে। সন্দীপন সেটা ভাল করেই জানে। তাই কমলিকা যাতে ঘূণাক্ষরেও টের না পায়, সেই ব্যাপারে ও সবসময় সতর্ক থাকে। সংসারে এসব পরকীয়ার প্রভাব পড়লেই বিপদ, দারুন অশান্তি হবে। এত কাজের চাপ, মানসিক চাপের মধ্যে, ও আর নতুন করে কোন ঝামেলা-অশান্তি চায় না। শুধু একটু নির্মল আনন্দ চায়। স্বর্ণালী ছাড়া আর কেই বা সেটা দিতে পারে? তাই অফিস টাইমে, প্রতিদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে, ফোনালাপে ওদের প্রেম জমে উঠতে থাকে।
স্বর্ণালীকে সন্দীপন বলে দেয়, 'আমি বাড়ি ফেরার পর, তুমি আর একদম ফোন করবে না। তখন আমি কিন্তু আর তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারব না। বৌ সন্দেহ করবে।'
'ঠিক আছে, বাবা। তোমার ফ্যামিলিতে কোন অশান্তি হোক, আমিও চাই না। শুধু আমাকে একটু সময় দিও রোজ। আমাকে ভুলে যেও না, প্লিজ।', কাতরভাবে বলে স্বর্ণালী। অনুপমের সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে যাবার পরে, ছোট্ট মেয়ে তুলিকে নিয়ে ও এখন বড় একা, অসহায়। ওর এখন ভীষণ দরকার একটা সত্যিকারের বন্ধু, একটা মানসিক সাপোর্ট, আর মাথা রাখার মত একটা চওড়া কাঁধ। যৌবনের কামোন্মত্ততায় ও'ও তখন ফুটছে, কোন একজন বিশ্বস্ত বন্ধু চাই সেই অভাব পূরণ করার জন্য।
সন্দীপন আর স্বর্ণালী দুজনেই বেশ কবার ভিডিও কলও করেছে, একে অপরকে জেনেছে, গাঢ় হয়েছে সম্পর্ক। শুধু কি ফোনফ্রেন্ড হলে আশ মেটে? তাই পরের বার সন্দীপন যখন কলকাতায় গেল, তখন দুজনে দেখাও করেছে একটা রেস্টুরেন্টে। সেখানে একে অপরকে চাক্ষুষ দেখে ওরা মুগ্ধ হয়েছে, ঘনিষ্ঠতা এক লাফে বেড়ে গেছে অনেকটাই।
আগল খুলে গেল। তারপর থেকে যখনই সন্দীপন ছুটি পেয়েছে, কমলিকাকে কিছুই জানায়নি। উল্টে স্টকইয়ার্ড ইনস্পেকশনের অফিসিয়াল কাজের ছুতো করে, ও একাই চলে এসেছে কলকাতায়। কমলিকা অতশত বোঝেনি, কোন সন্দেহও করেনি। 'আমাদেরও নিয়ে চলো না! কতদিন বাড়ি যাইনি।', কমলিকা শুধু রিষড়ায় ওর বাপের বাড়ি যাবার জন্য আবদার করেছে। কিন্তু সন্দীপন প্রতিবারই নানা ছুতোয় সেটা কাটিয়ে দিয়েছে, 'এই তো দু'দিনের জন্য যাব আর আসব। এবারে আর গিয়ে কী করবে? বরং পরের বার নিয়ে যাব।'
পরের বারও কলকাতা গিয়ে, কমলিকা-সোহিনীকে রিষড়ায় ছেড়ে দিয়ে, সন্দীপন তড়িঘড়ি অফিসের কাজের নাম করে বেরিয়ে পড়েছে। তারপর সোদপুরে গিয়ে স্বর্ণালীর সঙ্গে দেখা করে, যথারীতি দুজনে ক্যাবে করে সোজা চলে গেছে ডায়মন্ড হারবার রোডে জোকার কাছে 'গ্র্যান্ড গার্ডেন' রিসর্টে। ওখানে গার্লফ্রেন্ড নিয়ে সারা দিন আনন্দ করার জন্য কটেজ ভাড়া পাওয়া যায়। লাঞ্চ, স্ন্যাক্স, ডিনার সব পাওয়া যায়। মোটামুটি সস্তাই, তবে আসল ব্যাপার হল ওখানকার দারুন সেফটি আর প্রাইভেসি, কোন পুলিশের ঝুটঝামেলা নেই। ওখানেই দুজনে উদ্দাম আদর আর যৌনসুখে মেতে ওঠে গোটা দিনভর। তারপর স্বর্ণালীকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে, সন্দীপন চলে আসে নিজের বাড়ি। পরের দিন সন্ধ্যায় কমলিকাদের রিষড়া থেকে উঠিয়ে নিয়ে, ট্রেন ধরে আবার ফিরে আসে টাটা।
এভাবেই বেশ চলছিল। সন্দীপনের এই গোপন সম্পর্কের ব্যাপারে কমলিকা কিছুই জানতে পারেনি, বিন্দুমাত্র সন্দেহও করেনি । আসলে বাড়ি থাকলে, সন্দীপন কখনোই স্বর্ণালীর সঙ্গে ফোনালাপ করত না। তখন ফোনের ভাইব্রেট মোডে, শুধু চ্যাটিং আর মেসেজিং।
'তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না।', প্রায়ই বলত স্বর্ণালী।
'আমিও তোমাকে ছাড়া।', ভাবলেশহীনভাবে যেন মুখস্থ বুলি বলত সন্দীপন।
'কিন্তু আমি যে তোমাকে পুরোপুরি চাই, আমার নিজের করে চাই। এসো না আমার কাছে!', আব্দার করত স্বর্ণালী।
'পাগলের মত কথা বোলো না। জান না, আমার ফ্যামিলি আছে?', থামাতে চাইত সন্দীপন।
'তো আমি কী করব? আমি যে তোমাকে পাগলের মত ভালবাসি। তোমাকে সবসময় আমার শরীরে অনুভব করি। কী করব আমি, বলে দাও।', উত্তেজিত হয়ে বলত স্বর্ণালী।
কমলেশ জানে দু'নৌকায় পা দেবার জ্বালা। পরকীয়া করতে হবে গোপনে। তাতে শুধু থাকবে যৌনসুখ, উদ্দাম বাঁধনহীন আনন্দ, কিন্তু কোন দায়িত্ব বা পিছুটান নয়। এ তো শুধু ক্ষনিকের ভালবাসা, তাতে জড়িয়ে পড়ে ফেঁসে গেলে চলবে না। তাই সাবধানে সামলাতে চেষ্টা করত স্বর্ণালীকে। বলত, 'আমিও কি তোমাকে ভালবাসি না, বলো? কিন্তু এদিকটাও তো সামলে চলতে হবে, তাই না?'
'আমি কি তোমাকে কখনো জোর করেছি? কর না তুমি বউ-মেয়ে নিয়ে সংসার! শুধু আমি ডাকলেই আসবে তো?', স্বর্ণালী কাতরভাবে বলত।
'চেষ্টা তো করি।', নিরুত্তাপ সন্দীপন।
'আমি আর পারছি না, সন্দীপন। তোমাকে ছাড়া যে আমার দিন কাটে না। তুমি না থাকলে আমার সবকিছু ফাঁকা, বিশ্রী লাগে।', কাঁদতে কাঁদতে বলত স্বর্ণালী। কখনো বা রাগে চিৎকার করত, আবার কখনো আত্মহত্যা করার হুমকি দিত। এভাবেই চলছিল এক অবৈধ প্রেম। ক্রমশই বেড়ে উঠছিল ওদের মোহ, একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া। সেই সম্পর্কের কোন ভবিষ্যৎ নেই, কোন নাম নেই, তা কোনদিন কোন পূর্ণতাও পাবে না। শুধুমাত্র যৌন তাড়না। ওরা সেই সম্পর্কটাকেই জোড়াতালি দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিল, ক্রমশ ডুবে যাচ্ছিল এক নেশার চোরাবালিতে। তার থেকে বেরিয়ে আসার ওদের কারোরই কোন উপায় জানা ছিল না, ইচ্ছেও নয়। শুধু খুব হিসেব করে চলতে হত সন্দীপনকে, সংসারটা তো বাঁচাতে হবে। সে সমস্যা অবশ্য ছিল না ডিভোর্সি স্বর্ণালীর। তাই ও হয়ে পড়েছিল একটু বেশিই আবেগপ্রবণ, একরোখা আর জেদী। নিজের সবটুকু দিয়ে, প্রাণ দিয়ে, ও ভালবেসে ফেলেছিল সন্দীপনকে।
আগে মন, পরে তো শরীর। মানসিক বন্ধন না থাকলে কি আর শারীরিক সম্পর্ক আসে? সন্দীপনকে সমস্ত শরীর-মন সমর্পণ করেছিল স্বর্ণালী। ওদিকে সন্দীপন যতই জড়িয়ে পড়ছিল, ততই ভয় পাচ্ছিল সম্পর্কটাকে, যদি বেরিয়ে আসতে না পারে? যদি লোক জানাজানি হয়ে যায়? যদি ও ফেঁসে যায়? সংসারটা তো ভেসে যাবে তাহলে! না, কমলিকা-সোহিনীকে সন্দীপন জীবন দিয়ে ভালবাসে, তাদের ছেড়ে ও কিছুতেই থাকতে পারবে না। সংসারে এই সর্বনাশা সম্পর্কের কোন আঁচ ও আসতে দেবে না। স্বর্ণালীও সেটা মেনে নিতে বাধ্য হয়। ভীষণ কঠিন, তবু বাঁধতে হয় নিজের মনটাকে, রাশ টানতে হয় দুর্নিবার ইচ্ছে আর স্বপ্নগুলোতে, যে স্বপ্ন সব মেয়েই দেখে জীবনে। একবার সে স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে অনুপম, তবু আবারও স্বপ্ন দেখতে ওর ভীষণ ইচ্ছে করে। রক্ত মাংসের একটা নারীর শরীর-মন তো!
কী করে স্বর্ণালীকে বেঁধে রাখবে, বুঝতে পারে না সন্দীপন। শেষে একদিন বলে, 'আচ্ছা, তুমি এবার একটা বিয়ে করে নাও না! পাত্র দেখব?'
'কী বললে? বিয়ে! আবার! তুমি জান না, অনুপমের অত্যাচারের কথা? কীভাবে, কত কষ্ট করে আমাকে ডিভোর্স আদায় করতে হয়েছে? আজ আমি একটু শান্তিতে আছি, আর তুমি বলছ বিয়ে করে নিতে?', রেগে বলে ওঠে স্বর্ণালী।
'কিন্তু কতদিন এইভাবে চলবে, বলো? তোমারও তো একটা ভবিষ্যৎ আছে! মেয়েটা বড় হচ্ছে। ওর কথাও তো ভাবতে হবে।'
'থাক, তোমাকে আর অত মাথা ঘামাতে হবে না। আমার বাবা-মা আছে, আমাদের ঠিক চলে যাবে। এসব ভাবনা আমার। শুধু তুমি আমাকে টাইম দেবে বলো। যখনই আমি চাইব, আমার কাছে আসবে, বলো।', স্বর্ণালী আবেগতাড়িত হয়ে বলে।
আর এই আবেগকেই বড় ভয় সন্দীপনের, বশে না থাকলেই বিপদ। আবেগ সংযম করে, অঙ্ক কষে চলতে জানে সন্দীপন। সেখানে ঝুটো প্রেম আর শারীরিক খিদের ধান্দাবাজি। এর বাইরে আর কিছু জানে না ও। 'আরে আমি তো আছিই। কিন্তু আমারও তো ফ্যামিলি আছে, তাই না?', ও বলে।
'থাক, আর মনে করিয়ে দিতে হবে না, যে তোমার ফ্যামিলি আছে। আচ্ছা, তুমি কি আমাকে একটু বেহিসেবি ভাবেও ভালবাসতে পার না? সব সময় এরকম সিঁটিয়ে থাক কেন?'
'কী করব বল। যদি কেউ আমাদের একসঙ্গে দেখে ফেলে? তাহলে তো সব জানাজানি হয়ে যাবে। বৌ একবার জেনে গেলে আর আমাদের দেখা করা যাবে না, সব বন্ধ হয়ে যাবে। বুঝতে পারছ না?'
'সব বুঝেছি। তুমি দিনকে দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছ! আমার সঙ্গে ভাল করে কথা বল না, আদর কর না, আজকাল আমার মুখের দিকে পর্যন্ত তেমন তাকাও না।'
'ধুর, কী যে বল!'
'আমি সব বুঝি। কেন আমাকে এরকম কষ্ট দিচ্ছ, বল? আমি কী অন্যায় করেছি?'
সন্দীপন বেশ বুঝতে পারে, সম্পর্কটা থেকে ও বেরিয়ে আসতে পারছে না, এমনই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে। তবে কি ও'ও স্বর্ণালীকে ভালবেসে ফেলল? কিন্তু ও যে কমলিকাকে ভালবাসে, সোহিনীকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসে। ও যে বিবাহিত, কারো স্বামী, কারো বাবা। তাদেরকে তো আর অস্বীকার করতে পারবে না! ছেড়ে দিতেও পারবে না। ও তো মানুষ, জংলী পিশাচ নয়। কিন্তু পরক্ষণেই ওর মনে হয়, ভালবাসা কি আর একজনকে দিয়েই শেষ হয়ে যায়? তার নানা রূপ আছে। নানাজনকে নানাভাবে তা দেওয়া যায়। মানুষ তার মধ্যে কোনটার নাম দিয়েছে বৈধ, কোনটা বা অবৈধ। কিন্তু মন কি আর অতশত বোঝে, না মানে? স্বর্ণালীকে ছাড়া ও থাকতেই পারবে না। স্বর্ণালী ওর জীবনের অভ্যেসে পরিণত হয়েছে। ওর নিত্যকার প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে। ওর টেনশনে ভরা জীবনে, স্বর্ণালীই এক ঝলক টাটকা বাতাস। সুখস্বপ্নে জড়িয়ে রেখেছে ওকে, জীবনে ভাল করে বাঁচতে শিখেয়েছে। কী করে ওকে ছেড়ে দেবে সন্দীপন? দোনামনার দোলাচলে ও দুলতেই থাকে।
কিন্তু একদিন হঠাৎই সম্পর্কটা অন্য দিকে মোড় নেয়। স্বর্ণালী সেদিন ক্যাবে উঠেই বলে ওঠে, 'জানো, বাবা না আবার আমার বিয়ে দেবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। কী যে করি!'
'আরে এ তো ভাল কথা! রাজি হয়ে যাও। কী এমন বয়স তোমার?', সন্দীপন তৎক্ষণাৎ খুশি হয়ে বলে।
'কী বললে? তুমি পারলে এ কথা বলতে? জান না, বিয়ে হয়ে গেলে আমি আর তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারব না? তোমাকে ছাড়া আমি কী করে বাঁচব?', মুখ তুলে সন্দীপনের চোখে চোখ রেখে বলে স্বর্ণালী।
'খুব পারবে। চিন্তা নেই, মাঝে মাঝে তোমার বরকে লুকিয়ে চলে আসবে আমার কাছে। কোথাও না কোথাও আমরা ঠিক দেখা করে নেব। আমি যদি বউকে লুকিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারি, তুমি কেন পারবে না?'
'বাজে বোকো না তো! একটা মেয়ের পক্ষে সেটা অত সোজা নয়। বিয়ে হয়ে গেলে আর তোমার সঙ্গে দেখা হবে না। আমার অত সাহস নেই, বুঝলে?'
'কেন? আমার জন্য এটুকু করতে পারবে না?'
'না, তখন আমি বাঁধা পড়ে যাব। তুমি জান না, তুমি বুঝবে না।', স্বর্ণালীর চোখের কোণে এক ফোঁটা জল জমে।
তবুও দুজনের সম্পর্কটা টিঁকে রইল আরো কিছুদিন। কিন্তু একদিন হঠাৎ স্বর্ণালী ফোন করে দুঃসংবাদটা দিল। 'জান, অম্লানকে মনে হয় হ্যাঁ-ই বলে দিতে হবে।'
'অম্লান! সে আবার কে?'
'আরে ভুলে গেলে? সেদিন যে বললাম, বাবা একটা ছেলে দেখেছে।'
'ও হ্যাঁ হ্যাঁ, তা ও'ও কি ডিভোর্সি?'
'না না, ডিভোর্সি হতে যাবে কেন? তবে ওর আমাকে খুবই পছন্দ, কতবার যে বাড়িতে এল। আর ফোন? পারলে যেন ঘন্টায় ঘন্টায় করে।'
সন্দীপনের কথাগুলো শুনতে ভাল লাগে না। ওর রাইভাল এসে গেল নাকি? স্বর্ণালী অন্য কারো হয়ে যাবে? ওর অসহ্য লাগে কথাগুলো। কিন্তু মেনে নিতেই হবে, স্বর্ণালী ওর কে? কী অধিকার ফলাবে? তবু বলে, 'ও তোমার মেয়েকে মেনে নেবে?'
'হ্যাঁ, সেরকমই তো দেখলাম, মেয়ের সঙ্গে বেশ ভাব করে নিয়েছে এই ক'দিনে।', নতুন সংসারের স্বপ্নে তখন স্বর্ণালী বিভোর। সব মেয়েরই এমন হয়। যতদিন জীবনে কেউ আসেনি, স্বর্ণালী আঁকড়ে ধরেছিল সন্দীপনকে। এখন কিন্তু এখন ওর চোখে অন্য ভাবনা, অন্য পুরুষ এসেছে ওর জীবনকে নিশ্চিন্ত করতে। ওর কথাতেই খুশির সেই আভাস স্পষ্ট, বেশ বুঝতে পারে সন্দীপন।
'তাহলে আবার কী? বিয়ে করে নাও। ও নিশ্চয়ই তোমাকে ভালবাসবে।'
'দেখি। কাল ওর বাবা মা আসছেন।'
স্বর্ণালী এই প্রথম বিয়ের কথায় 'না' বলে চিৎকার করে ওঠে না। তার মানে ওকে এবার হারাতেই হবে! এতদিন যার থেকে মুক্তি পাওয়ারই কথা শুধু চিন্তা করে এসেছিল সন্দীপন, যাকে নিজের স্বার্থে শুধু যৌনতার পুতুল হিসেবে ভেবে এসেছিল, সেই স্বর্ণালীকে হারানোর কথায় কেন ওর মনটা এত খারাপ হয়ে যাচ্ছিল? স্বর্ণালী ওর থেকে চিরকালের মত অনেক দূরে চলে যাবে, এ কথা ভাবতেই কেন মনে এত কষ্ট উঠে আসছিল?
উৎকণ্ঠায় পরের দিনটা কাটে সন্দীপনের, আর ওকে ফোন করে না সারাদিন। বিচ্ছেদের ভাবনায় ওর মনটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। তা যাক, স্বর্ণালীরও তো নিজের একটা জীবন আছে, ভবিষ্যৎ আছে, সুখস্বপ্ন আছে। নতুন সংসার হোক ওর, ভাল হোক। ভাবতে থাকে সন্দীপন। সেইসঙ্গে ও নিজেও মুক্তি পাবে এই রোজকার টানাপোড়েনের জীবন থেকে, এই ভয়ঙ্কর পরকীয়া প্রেমের গোপনীয়তা বজায় রাখার নিত্যকার চাপের থেকে। ও এবার পুরোপুরি কমলিকার হাতেই নিজেকে সমর্পণ করে দেবে। যা ভুল হবার তা হয়েছে, এবার তার শেষ হোক। এ সবই ভাবতে থাকে ও।
পরেরদিন রাতে স্বর্ণালীই মেসেজ করে। সারাদিন ধরে ও কোন ফোন বা মেসেজ করেনি।
'সামনের বৈশাখে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল।'
'কনগ্রাচুলেশন্স, আমাকে নেমন্তন্ন করবে না?'
'তুমি এমন বোকার মত কথা বলো না!'
'কেন? আর আমাদের দেখা হবে না, না?'
ওদিক থেকে মেসেজের আর কোন উত্তর আসে না। সন্দীপন ভাল করেই বুঝতে পারে স্বর্ণালী ওকে ভুলে যেতে চাইছে, অতীত ভুলে সামনের দিকে তাকাতে চাইছে। আর সেটাই স্বাভাবিক।
'তাহলে এখানেই সব শেষ, তাই তো?'
আবারও মেসেজের কোন উত্তর আসে না। তখন সন্দীপন কাঁপা কাঁপা হাতে শেষ আর একটা মেসেজ টাইপ করে।
'আমি চললাম, বিদায়। আর আমাকে কোনদিনই খুঁজে পাবে না।'
মেসেজটা পাঠিয়ে দিয়ে চোখের জল লুকোতে চেষ্টা করে সন্দীপন। এখন ও বাড়িতে। কমলিকা রান্নাঘরে ব্যস্ত। এরপর মোবাইলটা অফ করে দেবে ও। তারপর চিরকালের মতো সব শেষ হয়ে যাবে, হারিয়ে যাবে একটা গোটা সম্পর্ক। মোবাইলটা অফ করার মুহূর্তেই, ভাইব্রেট করে শেষ একটা মেসেজ ঢোকে স্বর্ণালীর।
'তুমি সব সময় এরকম বল কেন?'
কিন্তু ততক্ষণে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে সন্দীপন। স্বর্ণালীকে ও ভালবাসে। আর সেই ভালবাসা চিরকালের মত, এখানেই স্থির হয়ে যাক। তা যেন ঘৃণা বা মনোমালিন্যে পরিণত না হতে পারে। ওকে সন্দীপন বাঁধনমুক্ত করে দিয়ে যাবে। আর কিচ্ছু করার নেই, ফিরে আসতেই হবে, এই সম্পর্কের শেষ টানতেই হবে। মনটা শক্ত করে, মোবাইলটা এয়ারপ্লেন মোডে করে দিয়ে, স্বর্ণালীর মেসেজগুলো একটা একটা করে মুছে দিল সন্দীপন। খুব কষ্ট হচ্ছে, বুকটা ধক ধক করছে উত্তেজনায়। কী করতে যাচ্ছে ও? কিন্তু ওকে পারতেই হবে। নিজের সম্মান থাকতে থাকতেই সরে আসতে হবে। সব মেসেজ, সব হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট ও মুছে ফেলে। তারপর ফেসবুকে স্বর্ণালীকে ব্লক করে দেয়। ফোনবুক থেকে ওর নামটাও মুছে দেয়। পুরোনো সব দিনের কথা, নানা ঘটনার কথা, একে একে মনে পড়ে যাচ্ছে, আর বুকটা ওর যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। সব যেন আজ খালি হয়ে গেল। স্বর্ণালী ওর নিজেরই অজান্তে, মনে এতটা জুড়ে ছিল?
আর একটা কঠিন শেষ কাজ করতে হবে, করতেই হবে। আর তাহলেই চিরকালের মতো মুক্তি। আর ওর সঙ্গে কোন যোগাযোগ করতে পারবে না স্বর্ণালী। চাইলেও না, মন দুর্বল হয়ে পড়লেও না। সন্দীপন ফোনটা অফ করে দেয়। তারপর সিমটাকে বের করে নেয়। তারপর দু'আঙুলের চাপে সিমটাকে ভেঙে দু'টুকরো করে ফেলে। তারপর সেটাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় জানলা দিয়ে বাইরে। আর কোনদিন সত্যিই স্বর্ণালী ওকে খুঁজে পাবে না। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, কিন্তু আর বেশি কিছু ভাবতে পারে না সন্দীপন। দ্রুত সামলে নেয় নিজেকে। কমলিকা কিছুই বুঝতে পারে না। ' কী গো, অনেক রাত হল তো! এবার খেতে দেব?', ও জিজ্ঞেস করে সরল মনে। 'হ্যাঁ, দাও, খিদে পেয়েছে।', নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে ওঠে সন্দীপন। কমলিকা হেসে চলে যায়। সন্দীপন একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। আজ ও ভারমুক্ত, অবশেষে ফেরত এসেছে কমলিকার কাছে, সোহিনীর কাছে। নিজের পরিবারের কাছে নিজেকে সমর্পন করে যে কী সুখ আছে, সেটা ও বুঝতে পারে।
ওর বাড়ি থেকে অনেক দূরে, অন্য কেউ, ঠিক তখনই বিছানায় মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে কি?
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment