28 January 2019

একটি চোরের কাহিনী

 
    সকাল থেকে হুলুস্থুলু।চোর ধরা পড়েছে ভটচাজবাবুর বাড়িতে। কুয়োতলায় ঘাপটি মেরে লুকিয়ে ছিল । দুই দারোয়ান তো একেবারে হামলে পড়েছে। সঙ্গে চাকর, মালি, ড্রাইভার।সবাই মিলে ঘিরে ধরে যা তা কান্ড !চোর বেচারা পালাবার পথ পায়নি। তারপরেই শুরু হয়েছে হাটুরে মার ,এখনো চলছে। ল্যাম্পপোস্টে বাঁধা হয়েছে হাড়জিরজিরে ভিখিরিপানা মানুষটাকে, খালি হাত জোড় করে বলছে, সে নাকি চুরি করেনি। কিন্তু কার কি?
    ভটচাজবাবুর বিশাল ব্যবসা,প্রচুর টাকা।নিন্দুকেরা বলে তার নাকি সবই ব্ল্যাকমানি। তিনি দু'তিনজন ইনকাম ট্যাক্স লইয়ার আর চাটার্ড একাউন্টেন্ট পুষেছেন মোটা টাকা দিয়ে। তারাই ট্যাক্স ফাঁকি আর ব্যালেন্সশীটের ফিকিরগুলো দেখে। চোরটা ধরা পড়ে মার খাওয়ার সময়, রাগের বশে অবশ্য বেজায় গাল পাড়ছিল। ভটচাজবাবুর দিকে ঘৃণাভরে তাকিয়ে, জ্বলন্ত চাওনি ছুঁড়ে দিয়ে বলেছিল ,"তুই ধরবি চোর! শালা চোরাই সোনার দোকানে এত রমরমা না ? তাই মুখে বড় বড় কথা!নিজের যত বেআইনি কারবার আর আমাকে বলিস চোর ?" ভটচাজবাবু দ্রুত গেটের ভেতরে ঢুকে গটগট করে ভেতরে চলে গেলেন ,গেট বন্ধ হয়ে গেল।
      চোরটাকে এসে মেরে গেল বাজার করতে, অফিস করতে আসা কত মানুষজন।এদিকে চোরটাও সমানে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হরেন সান্যালকে কথা শুনতে হল চোরটার কাছে। "কত টাকার কারেন্ট জালি  করে চুরি করেছিস রে, তোর বেআইনি তিনঘরার কারখানায়? মজুরদের তো ন্যায্য টাকা কিছুই দিস না, বারোঘন্টা অমানুষিক খাটাস।  তুই আবার এসেছিস আমাকে মারতে?"হরেন বাবু পালিয়ে বাঁচেন, ভিড়ে গা ঢাকা দেন ।পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন সুদখোর মানিক দাস ।তাক করে দু চারটে মোক্ষম মার তিনিও মেরেছিলেন ।চোরটা কঁকিয়ে উঠে বলে "চোরকে মারতে এসেছে, শালা সুদখোর! হাজার টাকার এক বছরের সুদও হাজার টাকা? শালা।" আবার দু'চারটে মার পড়ে, তবে এবার জোরটা একটু যেন কম। চোরটা মানিককে ছেড়ে, রেগে গিয়ে পাশে দাঁড়ানো ফিটফাট রবীন পাকড়াশির চোখে চোখ রেখে বলে "জাল ওষুধের কারবারটা কেমন চলছে রে রবীন?আর জাল বেবিফুডটাও চালিয়ে যাচ্ছিস ভালোই, নারে ?"রবীন আর মানিকবাবু একটু সরে গেলেন আড়ালে।
      এসি গাড়িটা ঘ্যাঁচ করে পাশে এসে থামল। কাঁচ নামিয়ে মুখ বার করলেন পাড়ার সম্মানীয় নেতা অতুল লাহিড়ী ।দেখলেন চোর পেটানো চলছে। "ও, ভালো করেছিস। মার শালাকে। কেলিয়ে বিন্দাবন দেখিয়ে দে।"চোরটা মুখ তুলে দেখে ।চেঁচিয়ে বলে "এই তো এসে গেছ বাবা দাপুটে নেতা।শালা, ভালোমানুষী দেখাচ্ছ? কটা বেনামে ফ্ল্যাট কিনে রেখেছ, কটা জমি দখল করেছ, কোথায় কোথায় তোলাবাজির টাকা লাগিয়েছ জানি না ভাবছ?" অতুলবাবুর গাড়ির কাঁচটা একটু উঠে যায় ,মুখটা বার করে হাজিমস্তানকে বলেন "এই, এটা কে রে? বিরোধী দলের মনে হচ্ছে। শালা মাওবাদী নয়তো?" চোরটার গলা এবার সপ্তমে "এই শালা হাজি,বল দেখি ,অনি-বুড়ো আর স্বপ্নার লাশগুলো কি করেছিলি? স্বপ্নার সঙ্গে কি করেছিলি বলে দেব নাকি? নিমেষে হাজিমস্তান  আর তার পূজনীয় নেতার গাড়ি হাওয়া হয়ে যায়।
         চোরটা মার খেয়ে আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়ছে।তাই দেখে লোকজনের জমায়েতের মধ্যে গুঞ্জন ওঠে। চোরটা কে, কোথা থেকে এল ? এত গোপন খবর ফাঁস হয়ে যাচ্ছে।চোরটা কি ঠিক কথা বলছে? সবার সব অপকর্ম ও জানলোই বা কি করে? কেউ কেউ বলে উঠলো ঠিকই তো বলেছে। কে যেন বলে উঠল , ও পাড়ার সুনীলবাবুরও তো ভুয়ো কোম্পানি আর কটা এনজিও খুলে সরকারি টাকা মেরে দিয়েছে। কে বলে ওঠে ওপাশের গলিতে একটা বেআইনি বাড়ি উঠছে ।কার যেন মার্সিডিজ গাড়ি আছে ড্রাগের ব্যবসার টাকায়,কার জাল নোটের কারবার,কোন বালি মাফিয়া ডাম্পারপিছু পুলিশ আর পার্টিকে কত যেন মাসোহারা দেয়,কোন নামকরা ডাক্তারের নার্সিংহোমে কিডনিপাচার আর কন্যাভ্রুণ হত্যার মত ঘৃণ্য কাজ হয়। বেআইনি কাজকর্মের  গল্প-আলোচনাই চললো মুখে মুখে।
      গনধোলাইয়ের আসরের ভিড়টা পাতলা হতে শুরু করে , চোরটার দিকে আর কারো কোন নজর নেই। এদিকে চোরটার ততক্ষণে হয়ে এসেছে। রক্ত ঝরছে সারা শরীর থেকে। চোখ থেকে অবিরাম জল গড়িয়ে পড়ছে, মুখ থেকে রক্ত লালা সিকনি সব মিশে  ছেঁড়া গেঞ্জি ভিজে গেছে ।অর্ধনগ্ন মানুষটার আর জ্ঞান নেই, মুখে আর কথাও নেই কোন। আর হয়তো কোন কথা ও কোনদিনই বলবে না, আর বললেই বা শুনছে কি কেউ ? নাকি শুনছে?????

No comments:

Post a Comment